ক্যারিশম্যাটিক মিনু: রাজশাহী বিএনপির ঐক্যের চাবিকাঠি নাকি কোন্দলের কেন্দ্র?
রাজশাহী তথা উত্তরাঞ্চলে জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থানের কারিগর হিসেবে পরিচিত মিজানুর রহমান মিনু। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেতা তার মেধা, বাচনভঙ্গি, পরিশ্রম, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে এ অঞ্চলে বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করেছেন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে টানা তিন মেয়াদে ২০০২ সাল পর্যন্ত মেয়রের দায়িত্বে থাকেন এই তারুণ্যদীপ্ত নেতা।
রাজনৈতিক সংগ্রাম ও উত্থান
এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারের সময়ে হামলা, মামলা, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মিনু। কারাজীবন বরণ করলেও রাজনীতিতে টিকে থেকে তিনি এখন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছেন। ভোটের রাজনীতিতে তার সাফল্য অব্যাহত রয়েছে। টানা ১৭ বছর মেয়রের দায়িত্ব পালনের পর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি, যেখানে তিনি সারাদেশে তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সংসদে ফিরেছেন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে।
মন্ত্রিত্ব ও রাজশাহীর প্রতিক্রিয়া
মিনুর মন্ত্রিত্ব পাওয়ার খবর রাজশাহীতে পৌঁছানোর পর বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হলেও, নীরব কোন্দল রয়ে গেছে। রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ-সদস্য হয়ে মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম রাজশাহীতে আসেন মিনু। সাধারণ নেতাকর্মীরা তাকে উচ্ছ্বসিতভাবে স্বাগত জানালেও, হাতেগোনা দু-একজন ছাড়া মহানগর বিএনপির নেতারা তার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় বা সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যাননি।
দলীয় কোন্দলের ইতিহাস
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর এরশাদ আলী ঈশাকে আহ্বায়ক ও মামুনুর রশিদ মামুনকে সদস্য সচিব করে রাজশাহী মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এই নতুন কমিটি সাবেক সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন ও চেয়ারপারসনের তৎকালীন উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনুকে দলীয় কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানানো বন্ধ করে দেয়। গত বছরের ১০ আগস্ট সম্মেলনের পর কেন্দ্র থেকে আবার নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়, যেখানে সাবেক সদস্য সচিব মামুনুর রশিদকে সভাপতি এবং মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান রিটনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এরপরেও মিনুর সঙ্গে দূরত্ব রয়ে যায় এবং তাকে দলীয় কর্মসূচির বাইরে রাখা হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জ
মিনু এখন ভূমিমন্ত্রী, আর মিলন রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ-সদস্য। আসন্ন রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বুলবুল ফের মেয়র প্রার্থী হতে পারেন, আবার মহানগর বিএনপির শীর্ষ কয়েকজন নেতাও দলীয় মনোনয়ন চান। ফলে দল মনোনীত মেয়র প্রার্থী নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে এবং নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। নেতাকর্মীরা বলছেন, মিনুর নির্বাচনে বুলবুল সার্বক্ষণিক পাশে থাকায় মহানগর বিএনপির নেতারা বিষয়টি ভালো চোখে দেখেননি। তারা মনে করছেন, মিনুর ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নের ব্যাপারে বুলবুল এগিয়ে আছেন, তাই মন্ত্রী মিনুকে তারা এড়িয়ে চলছেন।
মিনুর সম্প্রতি কর্মসূচি ও প্রতিক্রিয়া
মিনু মন্ত্রী হয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজশাহী আসার পর থেকে তার বাসায় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ঢল নামে। তিনি একুশের প্রথম প্রহরে রাজশাহীর নবনির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং শনি ও রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মহানগরীর সাহেববাজার এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে বসেন দলীয় নেতাকর্মী-অনুসারী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেখা করার জন্য। তবে এসব কর্মসূচিতে মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশীদ, সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন এবং ১ নম্বর সহসভাপতি নজরুল হুদাসহ কমিটির কয়েকজন নেতা উপস্থিত হননি। অন্যদিকে, মহানগর বিএনপির সহসভাপতি ওয়ালিউল হক রানা, আবুল কালাম আজাদ সুইট, আসলাম সরকার ও জয়নাল আবেদীন শিবলী মিনুর সঙ্গে দেখা করেছেন, যাদের মধ্যে রানা ছিলেন মিনুর প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট।
নেতাকর্মীদের মতামত
রাজশাহী জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক শফিকুল আলম সমাপ্ত বলেন, মিনুর মন্ত্রিত্ব পাওয়ায় রাজশাহীর নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ উচ্ছ্বসিত। তিনি মন্ত্রী হয়েই রাজশাহী ফিরে পরপর দুদিন দলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন, যা অভিভাবকসুলভ আচরণ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে। তবে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সঙ্গে তার ভোটের ব্যবধানে নেতাকর্মীরা মর্মাহত। হাতেগোনা কয়েকজন নেতা অখুশি হলেও মিনুর উদার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সহজাত নেতৃত্বে আস্থা রেখেছেন দলের নেতাকর্মীরা। এক সময় তাকে কোণঠাসা করা হলেও, রাজশাহীতে মিনুর হাতেই এখন বিএনপির স্টিয়ারিং রয়েছে বলে মনে করা হয়।
দলীয় নেতাদের বক্তব্য
মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ দাবি করেন, মিনুর সঙ্গে তাদের কোনো রাজনৈতিক বিরোধ নেই। তিনি বলেন, "আমরা বরাবরের মতোই একুশে ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহী কলেজে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছি। মিনু ভাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়েছেন। তার সঙ্গে সব সময় ফোনে কথা হচ্ছে। তাকে এড়িয়ে চলার বিষয়টি সঠিক নয়। আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন নিয়েও মনোমালিন্য নেই। আমরা দলের প্রতি অনুগত থেকে সবাই ঐক্যবদ্ধ আছি।"
মিজানুর রহমান মিনু নিজে যুগান্তরকে বলেন, "আমি অভিভাবক, সবাই আমার ছোট ভাই। এসব বিষয়ে কথা বলব না। আমরা সবাই একসঙ্গে ভোট করেছি, একসঙ্গেই আছি।" তার এই মন্তব্য দলীয় ঐক্যের প্রতি তার প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু রাজশাহী বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখনও সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে।
