নির্বাসন ফেরত নেতাদের বীরের বেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণের ইতিহাস
নির্বাসন ফেরত নেতাদের বীরের বেশে ক্ষমতায় আরোহণ

নির্বাসন ফেরত নেতাদের বীরের বেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণের ইতিহাস

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শাসকগোষ্ঠীর হাতে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জুলুম, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে এই চিত্র আরও প্রকট। এই খড়্গ ও দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে অনেক নেতাই পাড়ি জমান বিদেশে। স্বেচ্ছা বা জোরপূর্বক নির্বাসনে গিয়ে কেউ কেউ ফেরেন বীরের বেশে, বসেন মসনদে।

তারেক রহমান: ১৭ বছর নির্বাসনের পর প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তারেক রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় তাকে অমানবিক নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ আছে। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি মুক্তি পান এবং চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান।

লন্ডনে প্রায় ১৭ বছর নির্বাসনে ছিলেন তারেক রহমান। এই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের মাত্রা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তারেক রহমানের দেশে ফেরা দূরের কথা, বিএনপি ও অন্য রাজনৈতিক দলের বহু নেতা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। একে একে দেশে ফেরেন বহু রাজনীতিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী।

২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেই তিনি অভুতপূর্ব সংবর্ধনা পান। এরপর মাত্র দেড় মাসের প্রচেষ্টায় তিনি তার দলকে এনে দিয়েছেন ভূমিধস বিজয়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পায় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

বেনজির ভুট্টো: মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৭৭ সালে জন্মভূমি পাকিস্তানে ফেরেন বেনজির ভুট্টো। কিছুদিন পরই ক্ষমতা দখল করেন সেনাশাসক জিয়া উল হক। ওই বছর প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময় বেনজিরের বাবা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। এরপরই পাকিস্তানের রাজনীতিতে পা রাখেন বেনজির।

জিয়া উল হকের সরকার তাকে বহুবার গ্রেফতার করে। দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে বেনজির ১৯৮৪ সালে লন্ডন চলে যান ও ১৯৮৬ সালে দেশে ফেরেন। সরকারবিরোধী আন্দোলনে বেনজির জনমত গঠন করেন এবং ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট তিনি বরখাস্ত হন। ১৯৯৩ সালের নির্বাচনে তিনি আবার জয়লাভ করেন ও দ্বিতীয়বারের মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ মুসাভি খামেনি: ইসলামি বিপ্লবের প্রধান নেতা

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ মুসাভি খামেনি ছিলেন একজন ইরানি ধর্মীয় নেতা, রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক তত্ত্ববিদ ও বিপ্লবী। মাত্র দুবছর বয়সে তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল। মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির হোয়াইট রেভল্যুশন বা শ্বেত বিপ্লবের বিরোধিতা করায় ১৯৬৪ সালে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে তুরস্কের বুর্সায় নির্বাসিত করা হয়।

এর পর রুহুল্লাহ খামেনি ১৪ বছরেরও বেশি সময় নির্বাসিত জীবন কাটান। এই সময়ের সিংহভাগ তিনি ইরাকে অতিবাহিত করেন এবং তুরস্ক ও ফ্রান্সেও কিছুদিন ছিলেন। নির্বাসিত জীবনেই তিনি তিলে তিলে গড়ে তোলেন ইসলামি বিপ্লব। তিনি ছিলেন ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রধান নেতা, যার মাধ্যমে মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ইরান একটি ধর্মতান্ত্রিক ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। শাহের সরকারের পতনের পর ১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বীরের বেশে ইরানে ফেরেন খামেনি।

নেলসন ম্যান্ডেলা ও অন্যান্য নেতা

দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা আক্ষরিক অর্থে দেশের বাইরে নির্বাসিত ছিলেন না, তবে ২৭ বছর কারাবন্দি থাকা অবস্থায় তাকে রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত হিসেবেই দেখা হয়। ১৯৯০ সালে মুক্তি পাওয়ার পর চার বছরের ব্যবধানে ১৯৯৪ সালের প্রথম অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

এছাড়া ফ্রান্সের নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ও চার্লস ডি গল, রাশিয়ার ভ্লাদিমির লেনিন, মিয়ানমারের অং সান সু চি প্রমুখ নেতা নির্বাসন বা বন্দিত্বের পর ফিরে এসে দেশের শীর্ষ ক্ষমতায় আসীন হয়েছিলেন। তাদের সংগ্রাম ও বিজয়ের ইতিহাস রাজনীতির পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।