গ্রুপিংয়ের বলি বান্দরবান: ৩১ বছর পর বিএনপির সংসদ সদস্য জিতেও মন্ত্রিত্ব পেলেন না জেরী
বান্দরবান: দীর্ঘ ৩১ বছর পর বান্দরবানের একমাত্র সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হলেও গ্রুপিংয়ের কারণে মন্ত্রিত্ব পায়নি পার্বত্য এই জেলা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী, কিন্তু মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয় সুশীল সমাজ এবং বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের দাবি, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী এবং জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও সাবেক পৌরসভার মেয়র মো. জাবেদ রেজার গ্রুপে বিভক্ত বিএনপির রাজনীতির বলি হয়েছে বান্দরবান। বিগত সতের বছর আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবে মন্ত্রিত্বের যোগ্য দাবিদার হওয়া সত্ত্বেও জেরীকে মন্ত্রিত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
ঐতিহাসিক পটভূমি
নির্বাচন অফিস ও রাজনীতিবিদদের তথ্যমতে, বান্দরবানের রাজনৈতিক ইতিহাস জটিল গ্রুপিংয়ের সাক্ষী:
- ১৯৯১ সালে বীর বাহাদুর উশৈসিং আওয়ামী লীগ থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন
- ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত বিএনপির মাম্যাচিং সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন
- ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির সাচিং প্রু জেরী বিজয়ী হলেও জুনের পুনঃনির্বাচনে আওয়ামী লীগের বীর বাহাদুর উশৈসিং পুনরায় জয়ী হন
- ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির মাম্যাচিং ৮৫৩ ভোটে আওয়ামী লীগের বীর বাহাদুরকে পরাজিত করেন
২০০১ সালে বিএনপির বিদ্রোহী হয়ে রাজপুত্র সাচিংপ্রু জেরী ১৪ হাজার ভোট পান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহী প্রার্থী না হলে তার প্রাপ্ত ১৪ হাজার ভোট মাম্যাচিংয়ের ভোটবাক্সে যুক্ত হয়ে বিএনপি নির্বাচিত হতো।
গ্রুপিংয়ের দীর্ঘ ইতিহাস
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ, বান্দরবান বিএনপি গ্রুপিংয়ের রাজনীতিতে আবদ্ধ। রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ বিরোধে ১৯৯১ সাল থেকে বিএনপিতে এ গ্রুপিং শুরু হয়। রাজপরিবারের সম্পর্কে ভাগ্নে রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী এবং মামি রাজ পুত্রবধূ মাম্যাচিংয়ের মধ্যকার গ্রুপিংয়ের সূত্রপাত হলেও বর্তমানে তা জাবেদ-জেরী গ্রুপে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে চলমান এ গ্রুপিং এখন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও সাবেক পৌরসভার মেয়র মো. জাবেদ রেজা গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত।
নেতাদের প্রতিক্রিয়া
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন তুষার বলেন, "প্রত্যেকটি জেলার কর্মকাণ্ড বিএনপির কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের নজরদারিতে রয়েছে। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতেই মূল্যায়িত হয়। বান্দরবানবাসীর প্রত্যাশা ছিল মন্ত্রিত্ব পাওয়ার, কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন পর সংসদ সদস্য পেলেও মন্ত্রিত্ব থেকে বঞ্চিত হলাম।"
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক (জেরী গ্রুপের) মুজিবুর রশীদ মন্তব্য করেন, "প্রত্যাশা ছিল মন্ত্রিত্বের। কিন্তু প্রথম দফায় বাদ পড়লেও যোগ্যতার ভিত্তিতেই বান্দরবান সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী মূল্যায়িত হবেন, কেন্দ্র থেকে তেমনি আশ্বস্ত করা হয়েছে। আমরা এখনো আশাবাদী, দ্বিতীয় ধাপে হয়তো ভালো কিছু অপেক্ষা করছে।"
জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সাবিকুর রহমান জুয়েল বলেন, "দলের মধ্যে মতবিরোধ বিভাজন ছিল, আছে এবং থাকবে। এটি স্বাভাবিক বিষয়। বান্দরবানবাসীর প্রত্যাশা ছিল পার্বত্য মন্ত্রিত্ব, কিন্তু বঞ্চিত হলাম। এটি গ্রুপিংয়ের জন্য বলাটা সমীচীন হবে না।"
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সুবিধা
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বীর বাহাদুর উশৈসিং একটানা সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় সতের বছর পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান (মন্ত্রীর পদমর্যাদায়), পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এই দীর্ঘ সময় মন্ত্রিত্বের সুবিধা ভোগ করলেও বিএনপি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিজয়ী হয়েও মন্ত্রিত্ব পায়নি বলে স্থানীয়রা হতাশা প্রকাশ করেছেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির সাচিংপ্রু জেরী ৫১ হাজার ৫৪০ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে ১৯ হাজার ভোটে পরাজিত হন। তখনও বিএনপির একটি অংশ ভেতরে ভেতরে বিরোধিতা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরি বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেও গ্রুপিং পিছু ছাড়েনি বিএনপির। মতবিরোধ এবং বিভাজনের বলি এবার মন্ত্রিত্ব থেকে বঞ্চিত হলো বান্দরবানবাসী।
