বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন অমিত
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রবীণ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছোট সন্তান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন, যা তার পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারেরই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।
পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য
অমিতের বাবা প্রয়াত তরিকুল ইসলাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি জাতির পিতা জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার দুই মেয়াদের সরকারেও তিনি একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তরিকুল ইসলাম বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সাবেক তথ্যমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
অমিতের মা অধ্যাপক নার্গিস বেগম বর্তমানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় অমিতের রাজনীতিতে প্রবেশ প্রাকৃতিকভাবেই ঘটেছে। তিনি দুই সন্তানের জনক এবং তার সহধর্মিনীর নাম সোহানা পারভীন।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রাথমিক জীবন
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শিক্ষাজীবন বেশ সমৃদ্ধ। তিনি ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ থেকে ১৯৯১ সালে এসএসসি এবং ১৯৯৩ সালে এইচএসসি পাস করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে প্রাণরসায়ন ও আণবিক জীববিজ্ঞানে ১৯৯৬ সালে বিএসসি অনার্স ও ১৯৯৭ সালে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরে ২০০২ সালে তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে তিনি টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ফজলুল হক হলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা তার যোগাযোগ দক্ষতার প্রমাণ বহন করে।
রাজনৈতিক পথচলা
অমিত আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ২০০০ সালের দিকে, যখন তিনি যশোর জেলা বিএনপির সদস্য হন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল, যখন তিনি বাবার জীবদ্দশায় বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) হিসেবে দায়িত্ব পান। বর্তমানে তিনি দলটির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে যশোর-৩ (সদর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে ওই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠায় বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে।
সংসদ সদস্য থেকে প্রতিমন্ত্রী
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অমিত যশোর-৩ (সদর) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২ লাখ ১ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন, যেখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবদুল কাদের পেয়েছিলেন ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৬৩ ভোট।
নির্বাচনে জয়লাভের মাত্র পাঁচ দিন পর, ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এই নিয়োগ তাকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অমিত দলের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার ওপর অর্ধশতাধিক মামলা হয়েছে এবং তিনি বারবার কারাবন্দী হয়েছেন। বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খুলনা বিভাগের অন্যান্য জেলা ও উপজেলায় দলীয় কর্মসূচি পালন করা সম্ভব না হলেও অমিতের নেতৃত্বে যশোরে সফলভাবে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
এই সময়ে তার ব্যক্তিগত জীবনেও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তার বাড়িতে বারবার হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকেছেন এবং রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।
পেশাগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ড
রাজনীতির বাইরে অমিত পেশায় একজন ব্যবসায়ী ও সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- ল্যাবস্কান মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক
- লোকসমাজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক
তিনি বেশ কিছু সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য, যার মধ্যে রয়েছে:
- যশোর মেডিসিন ব্যাংক
- রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি
- যশোর ইনস্টিটিউট
- বাংলা একাডেমি
- যশোর প্রেস ক্লাব
- যশোর চেম্বার অব কমার্স
- যশোর ক্লাব
- ঝিনাইদহ এক্স ক্যাডেট অ্যাসোসিয়েশন
- গ্রাজুয়েট বায়োকেমিস্ট অ্যাসোসিয়েশন
- বাংলাদেশ বায়োকেমিক্যাল সোসাইটি
নেতাকর্মীদের প্রতিক্রিয়া
অমিতকে নতুন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পাওয়ায় বিএনপি নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বসিত। দলীয় নেতাকর্মীরা মনে করেন, এই গুরুদায়িত্ব অমিতকে আরও পরিণত ও শানিত করবে। তাদের মতে, এই নিয়োগের মাধ্যমে যশোরসহ সমগ্র অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রম গতি পাবে এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধিত হবে। তারা এজন্য দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
অমিতের এই নিয়োগ বিএনপির তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে দলীয় সূত্রগুলো মনে করছে। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং নিজস্ব যোগ্যতার সমন্বয়ে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সফলভাবে পালন করতে সক্ষম হবেন বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
