প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই পূর্ণমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, পিতার উত্তরাধিকার ছাপিয়ে ইতিহাস
প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই পূর্ণমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা

প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই পূর্ণমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, পিতার উত্তরাধিকার ছাপিয়ে ইতিহাস

মানিকগঞ্জ-৩ (সদর-সাটুরিয়া) আসনে বিপুল ভোটে জয়ের পর প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই পূর্ণমন্ত্রীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন আফরোজা খানম রিতা। ৫৫ বছরে এ আসনের প্রথম নারী প্রতিনিধি হিসেবে ইতিহাস গড়ার পর এবার তার ঝুলিতে যুক্ত হলো মন্ত্রিত্বের নতুন স্বীকৃতি। তিনি পেয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে- পিতার উত্তরাধিকার ছাপিয়ে কন্যার স্বতন্ত্র উত্থান।

ভোটের অঙ্কে রেকর্ড গড়া জয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটসমর্থিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাঈদ নূর পান ৬৪ হাজার ২৪২ ভোট। ব্যবধান দাঁড়ায় ১ লাখ ৩ হাজার ১০৩ ভোট। ১৫১ কেন্দ্রের মধ্যে ১৪৮টিতে এগিয়ে থেকে যে ফল তিনি উপহার দিয়েছেন, তা দেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনি ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারীদের ব্যবধানের ইতিহাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ২০০১ ও ২০০৮ সালের রেকর্ড দীর্ঘদিন আলোচনায় ছিল। ২০১৮ সালে গোপালগঞ্জ-৩ আসনে শেখ হাসিনার বিশাল ব্যবধানও আলোচিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের নির্বাচনে ব্যবধানের অঙ্কে সবচেয়ে বড় জয় এসেছে মানিকগঞ্জে।

অন্যান্য নারী প্রার্থীদের জয়

একই নির্বাচনে সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর (লুনা) ৭৯ হাজার ৩২১ ভোটে, ঝালকাঠি-২–এ ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো ৪৩ হাজার ২৯৫ ভোটে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২–এ রুমিন ফারহানা ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোটে, ফরিদপুর-২–এ শামা ওবায়েদ ৩২ হাজার ৯৫৩ ভোটে এবং নাটোর-১–এ ফারজানা শারমিন ১২ হাজার ১৫৮ ভোটে জয় পান। সংখ্যার হিসাবে ব্যবধানের শীর্ষে রয়েছেন আফরোজা খানম রিতা।

সাফল্যের পেছনের কারণ

স্থানীয় নেতাদের মতে, দীর্ঘ ১৬ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় উপস্থিতি, মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত কর্মীদের পাশে থাকা এবং সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত রাখাই তার সাফল্যের ভিত গড়ে দিয়েছে। সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে রাজপথে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও অবস্থান অটুট রাখার কারণে জেলা রাজনীতিতে তিনি আলাদা অবস্থান তৈরি করেন। এমনকি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক হয়রানির মুখেও তিনি পিছু হটেননি বলে দলীয় সূত্রের দাবি।

মানিকগঞ্জের রাজনীতিতে তাই এখন নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এক সময়ের মন্ত্রীর কন্যা শুধু উত্তরাধিকার বহন করেননি, ভোটের অঙ্কে নিজস্ব রেকর্ড গড়ে প্রথমবারেই মন্ত্রিত্বের চমক দেখিয়েছেন।

শিক্ষাগত ও পেশাগত পরিচয়

শিক্ষাগত উচ্চতায় তিনিও ছিলেন অনন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা আফরোজা খানম বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। তিনি মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান। তার স্বামী মইনুল ইসলাম মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আফরোজা খানমের তিন ছেলে সন্তান রয়েছেন:

  • বড় সন্তান মাইমুনুল ইসলাম অন্তু লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজ থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে মুন্নু সিরামিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
  • দ্বিতীয় সন্তান রাশীদ সামিউল ইসলাম অর্ক লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে মুন্নু ফেব্রিক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
  • কনিষ্ঠ সন্তান রাশীদ রাফিউল ইসলাম অর্নব লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারন্যাশনাল পলিটিকস বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে মুন্নু মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

রাজনৈতিক যাত্রা

শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাজনীতির মাঠেও দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন তিনি। ২০০১ সালে বাবার নির্বাচনি সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে জেলা ও কেন্দ্রীয় রাজনীতির নানা পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ২০১০ সালে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, পরে জেলা বিএনপির সভাপতি এবং সর্বশেষ আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় উপস্থিতি, মামলা-হামলার মধ্যেও দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে থাকা এবং সাংগঠনিকভাবে দলকে শক্তিশালী করার ভূমিকা তাকে জেলা রাজনীতিতে আলাদা অবস্থান এনে দেয়। স্থানীয় নেতারা বলছেন, কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাই আজকের এই প্রাপ্তির পেছনে বড় কারণ।

বিশ্লেষকদের মতামত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পিতার রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে হলেও নিজের অর্জনে সামনে এগিয়ে গেছেন আফরোজা খানম রিতা। ভোটের অঙ্কে রেকর্ড, সংগঠনে সক্রিয়তা এবং কেন্দ্রীয় আস্থার সমন্বয়েই তার মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি। মানিকগঞ্জের রাজনীতিতে তাই এখন নতুন সমীকরণ—পিতার উত্তরাধিকার ছাপিয়ে কন্যার স্বতন্ত্র উত্থান।

বাবা প্রয়াত হারুনার রশীদ খান মুন্নুর হাত ধরে রাজনীতিতে এসে পিতার মর্যাদায় আরও উচ্চমাত্রায় তুলে ধরলেন রিতা। বিগত স্বৈরাচার পতন আন্দোলন কর্মসূচিতে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে রাজপথে ছিলেন আফরোজা খানম। তিনিসহ দলের অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়। সরকার পতন আন্দোলনে জেলাসহ ঢাকায়ও সমানতালে অংশ নেন। মামলা ও হামলায় জর্জরিত দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে থেকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা করেন। এসব কারণে বিগত সরকার তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণসহ নানাভাবে হয়রানি করে। তবুও তিনি দমে যাননি। কঠিন ও কঠোর সময়ে নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মূলত তার নেতৃত্বেই এ জেলায় বিএনপি ঘুরে দাঁড়ায়।