লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে বিএনপি সংসদ সদস্যের কঠোর অবস্থান: চাঁদাবাজি ও সহিংসতায় মামলা ও গ্রেফতার
নির্বাচনের পর দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি ও কমলনগর) আসনের বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। তিনি চাঁদাবাজি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, যা দলের নেতৃত্বের নির্দেশনার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন।
রামগতিতে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের
দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মহড়ায় জড়িত হওয়ার অভিযোগে রামগতি উপজেলায় বিএনপির ২৬ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে রামগতি থানায় এসব মামলা দায়ের করা হয়। মামলার আসামিদের মধ্যে দুজনকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা বাড়িয়েছে।
মামলার পেছনের ঘটনা: চাঁদাবাজি ও ভাঙচুরের অভিযোগ
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি রামগতি উপজেলার চর পোড়াগাছা, রামদয়াল বাজার এবং আলেকজান্ডার ইউনিয়নের বালুর চর সুজনগ্রাম এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধভাবে চড়াও হয়। তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এলাকায় মহড়া দেয় এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ইটভাটা মালিকদের কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করেন।
চর পোড়াগাছা ইউনিয়নের ছিদ্দিক উল্লাহর ইটভাটায় গিয়ে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না পেয়ে ইটভাটার শ্রমিকদের মারধর করে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং মালিককে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া রামদয়াল বাজারে ব্যবসায়ী মনিরের দোকানে ভাঙচুর চালিয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতিসাধন করা হয়।
একইদিনে চর আলগী ইউনিয়ন ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রাব্বি, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রায়হান, ওয়ার্ড সভাপতি মো. আশিকের নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের সংঘবদ্ধ গ্রুপ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া দেয়। একপর্যায়ে ওই বাজারের ব্যবসায়ী মনিরের দোকানে ভাঙচুর চালানো হয়, যার ফলে ওই ব্যবসায়ীর ৫০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়।
মামলার বাদী ও আসামিদের তালিকা
এসব ঘটনায় রামগতি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন ও উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মমিন উল্লাহ ইরাজ বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা করেন। মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন:
- চর রমিজ ইউনিয়ন বিএনপি সাধারণ সম্পাদক হাজী বেলাল উদ্দিন
- উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শাহরিয়ার হান্নান
- সুমন উদ্দিন (ইউপি মেম্বার)
- চর রমিজ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মিরাজ হোসেন
- চর পোড়াগাছা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম
এছাড়া যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের মোট ২৬ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে।
সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন নিজানের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, ‘বিএনপি একটি সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দল। আমাদের নেতা তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, কোনও নেতাকর্মী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে পারবে না। নির্বাচনের বিজয়কে পুঁজি করে যারা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালাবে, তাদের দলে কোনও জায়গা নেই। অপরাধীর পরিচয় সে যে-ই হোক, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আমি নিজেই ভুক্তভোগীদের পক্ষে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছি। রামগতি কমলনগরের সর্বস্তরের মানুষের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিএনপি বা সহযোগী সংগঠনের যে কেউ অপরাধ করবে, আমরা কাউকে ছাড় দেবো না। বহিষ্কারসহ যেকোনো শাস্তির আওতায় আনা হবে।’
পুলিশের তৎপরতা ও গ্রেফতার
রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিটন দেওয়ান বলেন, ‘মামলার পর অভিযান চালিয়ে মিরাজ ও রিয়াজ নামে দুই আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।’ এই গ্রেফতার স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনাটি লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার বিষয়ে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে দলীয় নেতৃত্ব অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
