বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের বিজয়কে বাংলাদেশ ও গণতন্ত্রের বিজয় হিসেবে ঘোষণা করেছেন। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) বিকাল সাড়ে তিনটায় রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে নির্বাচন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
জনগণের ম্যান্ডেট ও নতুন যাত্রার সূচনা
তারেক রহমান বলেন, 'দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণ আবারও বিএনপিকে বিজয়ী করেছে। আলহামদু লিল্লাহ। এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় গণতন্ত্রের।' তিনি উল্লেখ করেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর সরাসরি ভোটে জবাবদিহিমূলক সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
রাষ্ট্র মেরামত ও ৩১ দফা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি
বিএনপি চেয়ারম্যান দৃঢ়ভাবে জানান, জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট অনুযায়ী দল নির্বাচনী অঙ্গীকার ও ৩১ দফা বাস্তবায়নে সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিএনপি যে রূপরেখা উপস্থাপন করেছিল, তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান বলেন, 'ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অকার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ পুনর্গঠনের মধ্য দিয়েই নতুন যাত্রা শুরু হবে।' বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দলের সঙ্গে মতবিনিময়ের ভিত্তিতে প্রণীত ৩১ দফা এবং দলীয় ইশতেহারের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিএনপি কাজ করবে বলেও তিনি জানান।
জাতীয় ঐক্যের আহ্বান ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা
জাতীয় ঐক্যের উপর জোর দিয়ে তারেক রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও গণঅধিকার পরিষদসহ ৫১টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। তিনি অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, 'আমাদের পথ ও মত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।'
নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, যে কোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে এবং কোনো রকম অন্যায় বা বেআইনি কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না। সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিজয় মিছিল না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধা নিবেদন
অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, '১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহীদ ও হতাহত হয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। যাদের রক্তের বিনিময়ে আজকের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, তাদের অবদান জাতি চিরকাল স্মরণ রাখবে।'
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, দেশের এমন আনন্দঘন সময়ে তাঁর অনুপস্থিতি দলকে ভারাক্রান্ত করেছে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান জাতি কখনো ভুলবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, 'এখন দেশ গড়ার পালা। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।'
সবশেষে বিশ্বের গণতান্ত্রিক শক্তি, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণকে আবারো অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাগত বক্তব্য রাখেন। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
