বিএনপি চেয়ারম্যানের আহ্বান: দুর্নীতি রোধ ও আইনশৃঙ্খলায় ভূমিকা রাখুন
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের গণতান্ত্রিক জনগণকে দুর্নীতি রোধ, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ ও মানবিক দেশ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আসুন, যেভাবে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ভূমিকা রেখেছিলাম, একইভাবে এবার দুর্নীতি রোধ, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ ও মানবিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখি।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলন
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জনের পর এটিই ছিল তার প্রথম সংবাদ সম্মেলন। নির্বাচনের ফলাফলকে ‘গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের বিজয়’ হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘শত প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে আমরা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছি। ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু করতে হচ্ছে।’
সব রাজনৈতিক দলের প্রতি অভিনন্দন ও ঐক্যের আহ্বান
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রের বাতিঘর। সরকার ও বিরোধী দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। আমাদের পথ ও মত ভিন্ন থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।’
একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথে তিনি ভিন্ন দল কিংবা ভিন্নমতের সবার সহযোগিতা কামনা করেন। অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘জনমনে সৃষ্ট সব সংশয় কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশে শান্তিপূর্ণভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্মকর্তা, প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা ছাড়া এটি সম্ভব হতো না।’
বিএনপির প্রতিশ্রুতি ও খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা
৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেছিল। জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার আমরা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করব।’ খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘এমন আনন্দঘন মুহূর্তে আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি আমাদের ভারাক্রান্ত করেছে। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন ছিলেন, কখনো মাথা নত করেননি।’
শান্তি বজায় রাখার আহ্বান ও আইনের শাসনের গুরুত্ব
দলীয় নেতাকর্মীদের শান্ত ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘শত উসকানির মুখেও নেতা-কর্মীরা শান্ত থেকে বিজয় উদ্যাপন করেছেন। কোনো অপশক্তি যেন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে, সে জন্য বিজয় মিছিল না করার নির্দেশনা দিয়েছিলাম। যেকোনো মূল্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো অজুহাতেই দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ বরদাশত করা হবে না। ন্যায়পরায়ণতা হবে আমাদের আদর্শ।’
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, ভিন্নমত কিংবা ভিন্নপথ—প্রতিটি নাগরিকের জন্যই আইন সমান হবে। নির্বাচনের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে ভুল–বোঝাবুঝি হতে পারে, তবে তা যেন প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রসঙ্গ
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তারেক রহমান ও মঞ্চে থাকা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। বিএনপিকে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেতে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশ্রয় নিতে হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণকে কনভিন্স করাটাই আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং। আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিংটা ছিল জনগণকে আমাদের পক্ষে নিয়ে আসা। সেটাতে আমরা সফল হয়েছি।’
এই সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমানের বক্তব্যে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি রোধের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
