জামায়াতের ভোটকেন্দ্র দখল ও কারচুপি অত্যন্ত হতাশাজনক: বিএনপির সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ
জামায়াতের ভোটকেন্দ্র দখল ও কারচুপি: বিএনপির হতাশা

জামায়াতের ভোটকেন্দ্র দখল ও কারচুপি অত্যন্ত হতাশাজনক: বিএনপির সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জামায়াতের ভোটকেন্দ্র দখল, অবৈধ অর্থের ব্যবহার, কারচুপি ও জালভোটসহ নৈরাজ্যের নানা পথ বেছে নেওয়াকে অত্যন্ত হতাশাজনক বলে অভিহিত করেছে। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।

সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য

নজরুল ইসলাম খান বলেন, "পরাজয়ের আশঙ্কায় জামায়াত যেভাবে সহিংসতা, ভোটকেন্দ্র দখল, অবৈধ অর্থের ব্যবহার, কারচুপি ও জালভোটসহ নৈরাজ্যের নানা পথ বেছে নিয়েছে, তা অত্যন্ত হতাশাজনক।" তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও দেশের জনগণের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, "এত বছর লড়াই করে যা আমরা অর্জন করতে যাচ্ছি, সেটা যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সেজন্য পালাক্রমে কেন্দ্রগুলো পাহারা দেবেন। আপনারা সবাই ভোটকেন্দ্রে যাবেন, ভোট দেবেন এবং ভোটের ফলাফল বুঝে নিয়ে তারপরে ভোটকেন্দ্র পরিত্যাগ করবেন।"

তিনি আরও যোগ করেন, "এ সবটাই আমরা চাই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে, জনগণের সমর্থনে শক্তিশালী একটা গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।"

জামায়াতের বিভিন্ন অভিযোগের বিবরণ

সংবাদ সম্মেলনে নজরুল ইসলাম খান ভোটের আগের দিনে ও রাতে সারাদেশে জামায়াতের সহিংসতা, ভোটকেন্দ্র দখল, অবৈধ অর্থের ব্যবহার, কারচুপি ও জালভোটের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনার কথা বলেন:

  • সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ৭৪ লাখ টাকা নিয়ে আটক জামায়াতের ঠাকুরগাঁও জেলা আমিরের বার্ষিক আয় সাড়ে চার লাখ টাকা।
  • শরীয়তপুরে সাড়ে ৭ লাখ টাকাসহ জামায়াতকর্মী আটক ও ২ বছরের কারাদণ্ড।
  • টাকা বিতরণের অভিযোগে নেত্রকোণা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির আটক।
  • সৈয়দপুর, কুমিল্লা, শরীয়তপুর ও পটুয়াখালীতে টাকাসহ জামায়াতের ১২ নেতা আটক করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পটুয়াখালী-১ আসনে ভোটারদের টাকা দেওয়ার অভিযোগে জামায়াত নেতা আটক, পল্লবীতে জামায়াতের ২ পোলিং এজেন্টের কারাদণ্ড ও কেন্দ্র থেকে অফিসার বহিস্কার, ভোটারদের টাকা বিতরণ, জামায়াতের শিক্ষককে কারাদণ্ড, ভোট কিনতে গিয়ে জনতার ধাওয়া, দৌড়ে পালালেন জামায়াত নেতা, নোয়াখালীতে জামায়াতের লোকজন হ্যান্ডবিল ও টাকাসহ জনতার জেরার মুখে পড়েছে।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ

নজরুল ইসলাম খান আরও কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করেন:

  1. দাড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার চাপ, গৃহবধূকে একা পেয়ে ধর্ষণচেষ্টা জামায়াত কর্মীদের।
  2. সংখ্যালঘুদের বাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ জামায়াতের বিরুদ্ধে।
  3. রাজধানীতে ভোটকেন্দ্র দখল চেষ্টার অভিযোগ।
  4. ঝিনাইদহ-৪ দাড়িপাল্লার এজেন্টদের স্বাক্ষরিত ২৩টি রেজাল্ট শিট জব্দ।
  5. জামায়াত নেতার মাছের খামার থেকে জিআই পাইপ ও ককটেল তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার।

তিনি বলেন, রাজশাহীতে কৃষকদল নেতার রগ কেটে দিয়েছে, মিরপুরের রূপনগরে অস্ত্রসহ জামায়াত কর্মীকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জে জনতার হাতে আটক জামায়াত নেতা, রাতে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ ও জামায়াত নেতা আটক, রাজধানীতে ভোট কেনার সময় জামায়াতের স্থানীয় নায়েবে আমির আটক, টাকা বিলি করার অভিযোগে গোদাগাড়ীতে জামায়াত আমিরের গাড়ি ঘেরাও ও সিলসহ জামায়াত কর্মীকে হাতেনাতে ধরে এলাকাবাসী, বগুড়ায় রাতে ভোটকেন্দ্রে ঢুকে জামায়াত নেতা আটক, মির্জাগঞ্জে অভিযোগে জামায়াত কর্মী আটক ও মুচলেকায় মুক্ত, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার দায়িত্বে সাবেক জামায়াত নেতা, ব্যালট খোলার অভিযোগ নিয়ে উত্তেজনা হয়েছে। নোয়াখালীতে ধানের শীষের নারী কর্মীকে পিটিয়ে আহত, যুবদল নেতাকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। তোপের মুখে জামায়াতের এমপি প্রার্থী (ঢাকা-১৪), দুই জামায়াত নেতাকে আটকে রাখে বিএনপি নেতাকর্মীরা।

বিএনপির দাবি ও প্রত্যাশা

নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, "জামায়াতের এরকম অসংখ্য অনৈতিক ও ভোট কারচুপির ঘটনা বেরিয়েছে, যা দুঃখজনক। আমরা চাই, জাতীয় সংসদ নির্বাচনটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হোক। এই নির্বাচনের জন্য আমাদের অনেক সাথী জীবন দিয়েছেন। আমরা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা চাই। জনগণের সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যেতে চাই। এবং সেই দায়িত্ব পেয়ে আমরা জনগণের কল্যাণ সাধন করতে চাই। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন করতে চাই। নির্বাচনি ইশতিহারে আমাদের দলের চেয়ারম্যান যা ঘোষণা করেছেন, আমরা সেসব বাস্তবায়ন করতে চাই।"

তিনি আরও বলেন, "এর পথে নানা বাধা নানাভাবে সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে। কেউ সৃষ্টি করছে যারা আমাদের এই গণতন্ত্র পুনর্বহালই পছন্দ করেন না। তারা মনে করছেন নির্বাচনে তাদের জেতার সম্ভাবনা কম।"

মাহদী আমিনের বক্তব্য

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, "দীর্ঘদিন পর দেশের মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবেই এই নির্বাচন ঘিরে সবার মাঝে গভীর আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা কাজ করছে। বিএনপি ও তারেক রহমানের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় বিএনপির বিজয় ইনশাআল্লাহ অনিবার্য, যা আজ দেশ-বিদেশের সর্বজনীন বিশ্বাস।"

তিনি আরও বলেন, "শতাধিক কেন্দ্রে একদিন আগে থেকেই তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকান্ডের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেই গ্রেফতার হয়েছেন, এবং বিভিন্ন স্থানে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধও দেখা গেছে। অসংখ্য ঘটনার মধ্যে জামায়াত জোটের অবৈধ ও অনৈতিক কার্যক্রম, আচরণবিধি লঙ্ঘন, এবং পরিকল্পিত নাশকতার যে বিষয়গুলো মূলধারার গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, তার গুটিকয়েক সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়েছে।"

অন্যান্য উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ইসমাইল জবিউল্লাহ, বিএনপির চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী প্রমুখ। এই সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে বিএনপির অবস্থান ও জামায়াতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ বিশদভাবে উপস্থাপন করা হয়।