সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপি নেত্রীর আবেগঘন প্রশ্ন
সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন না পাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট শাহানা আক্তার শানু। মঙ্গলবার রাতে নিজের ফেসবুক পাতায় দেওয়া দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি ৩৮ বছরের রাজনৈতিক জীবনের নানা ত্যাগ ও সংগ্রামের স্মৃতিচারণ করে দলের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন- 'আর কত ত্যাগ স্বীকার করলে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন মিলবে?'
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের স্মৃতিচারণ
শাহানা আক্তার শানু তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, '১৯৮৭ সালে সোনাগাজী কলেজ সংসদের নির্বাচিত সম্পাদক পদ নিয়ে পথচলা শুরু করি। ৯০-এর এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল আমার। ১৯৯২ সালে বদরুন্নেসা সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলাম।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে বর্তমান যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদিকা অপু উকিলকে হারিয়ে তখন শিরোনামে ছিলেন।
তার রাজনৈতিক পদযাত্রায় তিনি দুবার বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য, জাতীয়তাবাদী মহিলা দল কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম ডিভিশনের কমিটি করার দায়িত্বপ্রাপ্ত টিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জানান, 'তখন বারবার বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল।'
পরিবারের উপর নির্যাতনের বর্ণনা
৩৮ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি একদিনের জন্যও অবসরে ছিলেন না বলে দাবি করেন এই নেত্রী। ছাত্রদল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অসংখ্যবার হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন তিনি এবং তার পরিবার। তিনি লিখেছেন, 'তৎকালীন জয়নাল হাজারীর স্টিয়ারিং কমিটির দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলাম পরিবারসহ। প্রথমবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অসংখ্যবার আমার বাড়িতে হামলা হয়েছিল।'
তার বৃদ্ধ বাবাকে বারবার ধরে নিয়ে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। 'তার অপমান সহ্য করতে না পেরে অকালে উনি মারা যান, যা তৎকালীন এমপি মোশাররফ হোসেন জানতেন,' যোগ করেন তিনি।
স্বামীর ব্যবসায়িক অফিস পল্টনে হওয়ায় আন্দোলনে নেতাকর্মীরা তার অফিসে আশ্রয় নিয়েছে অনেকবার বলে জানান শানু। এর ফলে তার স্বামীকে পুলিশের রোষানলে পড়তে হয়েছে অসংখ্যবার। পল্টনে কোনো ঝামেলা হলেই তাকে মামলার ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা তৎকালীন পল্টন থানা নিয়েছিল বলে তার দাবি।
মেয়ের চাকরি না পাওয়া ও দলের সেবা
তার মেয়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ফার্স্ট ক্লাশ থাকার পরও তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে জানান শাহানা আক্তার শানু। 'কারণ সে একজন বিএনপি নেত্রীর মেয়ে,' বলেন তিনি।
তিনি '৯০-এর আন্দোলন, ১৭ বছরের আন্দোলন, জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হওয়ার কারণে ম্যাডাম খালেদা জিয়ার মামলাসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে বিনাপয়সায় আইনি সহায়তা দিয়েছেন তিনি। করোনা ও বন্যায় ফেনীসহ সারা দেশে মহিলা দলের সভানেত্রী, সাধারণ সম্পাদকসহ শারীরিক ও আর্থিকভাবে সহায়তা দিয়েছেন দলের সঙ্গে থেকে।
খালেদা জিয়ার প্রতিশ্রুতির স্মৃতি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, '২০০৯ সালে দেশনেত্রী, গণতন্ত্রের মা, ম্যাডাম খালেদা জিয়া মনোনয়নের সময় আমার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে বলেছিলেন- আমার কাছে তোমার মূল্য অনেক বেশি। সামনের বার বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তোমাকে এমপি বানানো হবে।' তখন সেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অনেক মাননীয় সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
১৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মনোনয়ন সাক্ষাৎকারে এক মিনিট সময়ের মধ্যে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে এ কথাগুলো বলতে পারেননি তিনি। 'ম্যাডামের দেওয়া এই প্রতিশ্রুতির কথা মনে পড়লে আজ চোখ ঝাপসা হয়ে আসে,' লিখেছেন শানু।
সংরক্ষিত আসন প্রসঙ্গে মতামত
ফেনীর এই কন্যা বলেন, 'আমি মনে করি, সংরক্ষিত আসন দলের পক্ষ থেকে নারীদের জন্য একটি উপহার। উপহারের চেয়েও আমার কাছে বড় কথা হলো যে, আমাদের সমাজের পিছিয়ে পড়া এবং নির্যাতিত নারীদের জন্য কাজ করার সুযোগ পায় একজন সংরক্ষিত আসনে মনোনীত নারী।'
তিনি মনে করেন, এই সেবার সুযোগটি একজন নারীকে বারবার না দিয়ে একাধিক নারীর মাঝে বণ্টন করলে এরূপ বৈষম্য হবে না। দলের তৃণমূল থেকে শুরু করে দলের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সবাই তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার সম্পর্কে জানেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
'তাই এবার আশা করেছিলাম, দল আমাকে মূল্যায়ন করবে এবং বড় পরিসরে জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেবে,' বলেন তিনি। বর্তমানে যাদের এবার সংরক্ষিত আসনে মনোনীত করা হয়েছে, তারা সবাই অবশ্যই যোগ্য এবং দলের জন্য নিবেদিত বলে মন্তব্য করেন শানু। তবে তাদের বেশির ভাগই দলীয় পদে এবং বয়সে তার চেয়ে অনেক ছোট বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে আবেদন
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, 'বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, মিছিলের শেষ ছেলেটিকেও আপনি মূল্যায়ন করবেন। আমি বর্তমান বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে আপনার মূল্যায়নের অপেক্ষায়।'
তিনি আরও বলেন, 'সব সময় দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি ৩৮ বছর, কখনো দ্বিমত পোষণ করিনি। দলকে ভালোবাসি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনেক শ্রদ্ধা করি, তাই এবারো দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। তবে আশা করব, দল অতি শিগগিরই আমাকে মূল্যায়ন করে এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবে।'
শাহানা আক্তার শানু শেষ করেন এভাবে- 'যেন নিজের কাছে নিজে হীনমন্যতায় ভুগতে না হয় আমাকে, দলকে নিঃস্বার্থভাবে নিজ জীবনের ৩৮ বছর দিয়ে দেওয়ার পর- সবার আগে বাংলাদেশ।' উল্লেখ্য, এবারসহ তিনি চারবার সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন বলে জানান।



