তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে সামাজিক ও অবকাঠামো খাতে কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হলেও সাংগঠনিক কার্যক্রমে মন্থরগতি লক্ষ্য করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দলীয় কোন্দল থামাতে না পারা, তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের দূরত্ব, সাংগঠনিক নেতাদের সরকারি দায়িত্বে ব্যস্ততা, নির্দেশনা অমান্য করে ভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের অন্তর্ভুক্তি এবং 'হাইব্রিড' সদস্যদের আধিপত্য—সব মিলিয়ে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা কাজ করছে বলে মনে করছেন তারা।
সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল
সরকার গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন জেলায় অভ্যন্তরীণ বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। তৃণমূল পর্যায়ে দলের দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, এমনকি হত্যাকাণ্ডের খবরও এসেছে। সর্বশেষ ৪ জুন ঝিনাইদহের শৈলকূপায় বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ৬২ জন আহত হন। এর আগে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত রাজশাহী জেলা ও মহানগরে সংঘর্ষে দুই জন নিহত হন। হবিগঞ্জের মাধবপুর, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ভিন্ন দলের নেতাকর্মী ভিড়ানোর অভিযোগ
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বিএনপি অন্য দলের নেতাকর্মীদের দলে ভিড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও তা তৃণমূলে মানা হচ্ছে না। ৩ জুন গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. কে এম বাবরের হাতে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ছনোয়ার হোসেন মোল্লা ও নুর ইসলাম শেখের নেতৃত্বে ১২০০ নেতাকর্মী। এছাড়া গাজীপুরের টঙ্গীতে জাতীয় পার্টির শতাধিক নেতাকর্মী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী ও কুমিল্লায়ও বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। দলীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে এই যোগদান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, 'অন্য দলের নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগদানের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এখনও বলবৎ। সবাইকে দলের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।'
সাংগঠনিক নেতারা সরকারে থাকায় প্রভাব
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপির অনেক শীর্ষ সাংগঠনিক নেতা সরকারের বিভিন্ন পদে থাকায় মাঠকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এলজিআরডি মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছেন, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তারা আগের মতো দলকে সময় দিতে পারছেন না। নিবেদিতপ্রাণ বিকল্প নেতৃত্বের সংকটও দেখা দিয়েছে।
সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'নির্বাচনের পর বিএনপিতে অনেকে যোগ দিয়েছেন, তবে হাইব্রিডদের তৎপরতা এখনও তেমন দেখা যাচ্ছে না। নতুন আগতদের বিষয়ে দলকে সতর্ক থাকা উচিত। বিএনপির মাঠ কাঁপানো অনেক নেতা সরকারে যোগ দেওয়ায় দলীয় কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নজরুল ইসলাম খান ও রিজভীর মতো নেতাদের দলীয় কাজে পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ তারা নেতাকর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতেন। ত্যাগীদের মূল্যায়ন না করায় তৃণমূলে হতাশা তৈরি হতে পারে। স্বতন্ত্র হিসেবে বিজয়ীদের কোণঠাসা করে রাখাও ঠিক হচ্ছে না।'
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, 'সরকার মাত্র তিন মাস অতিক্রম করলো। সব কিছু পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তবে দল হিসেবে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে পর্যালোচনা হচ্ছে। দলের সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব না কমালে সাংগঠনিক কার্যক্রমের গতিশীলতা থাকবে না।'
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, 'সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ বেশি দিন হয়নি। তৃণমূলের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সব কিছু গুছিয়ে দল তৃণমূলকে আরও ঢেলে সাজানো হবে।'



