১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি অতিক্রম করেছে একশ দিন। যদিও একটি সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নে এটি খুব কম সময়, কিন্তু কিছু বিষয় সহজেই বোঝা যায়, যার জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হয় না। সেই রকম বিষয়-আশয় নিয়ে কমবেশি আলোচনায় রয়েছে বিএনপি। তবে এখনও পর্যন্ত বিএনপির নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত যে ‘একেবারেই দল হিসেবে’ বিএনপির সিদ্ধান্ত, এমন ভাবা কঠিন। কখনও মনে হচ্ছে, বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে, আবার কখনও মনে হচ্ছে— পুরোনো বিএনপির পথেরই যেন পুনরাবৃত্তি।
সরকারের সাফল্যের দাবি
সরকারের এই একশ দিনের সফলতা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, ‘প্রথম ১০০ দিনেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার লুণ্ঠিত রাষ্ট্রীয় মালিকানা জনগণের কাছে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে; মজবুত করে চলেছে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত, দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।’ তিনি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে বিষয়ভিত্তিক ও খাতনির্ভর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দেন, যার ফলে পুরো রাষ্ট্রকাঠামো একযোগে লক্ষ্য স্থির করে, নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অনিঃশেষ কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের অভূতপূর্ব এই কর্মযজ্ঞে সাধারণ মানুষের জীবনমানে ইতোমধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য খাতে উদ্যোগ
সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের গৃহীত উদ্যোগ ইতোমধ্যেই দেশের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে বলে জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মাসেই সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে নারীকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করেছে। নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রধানদের জন্য সম্মানী প্রদানের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এছাড়া জনদুর্ভোগ লাঘবে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহার করে সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে।’
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন
সরকারের মন্ত্রিসভা ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ মে পর্যন্ত মোট ১০টি কেবিনেট সভা সম্পন্ন করেছে। এসব সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি সিদ্ধান্ত, অর্থাৎ প্রায় ৬২ শতাংশ, ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২৩টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
নির্বাচনের আগে দেওয়া বিএনপির বিভিন্ন আশ্বাসের সঙ্গে বৈরিতাও ফুটে উঠেছে নির্বাচনোত্তর বিএনপিতে। যেমন ২০২৪ সালের চরম উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন যে, বিএনপি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার দর্শনে বিশ্বাসী নয়। এমনকি নির্বাচনের প্রাক্কালে তারেক রহমানও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ‘টাইম ম্যাগাজিন’-এ দেওয়া সেই বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারে তিনি যখন বলেছিলেন, “আজ যদি একটি দল নিষিদ্ধ করা হয়, তবে কাল আমার দলও নিষিদ্ধ হবে না তার নিশ্চয়তা কী?”— তখন সাধারণ মানুষের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। তার এই উক্তিটি কেবল একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়, এক ধরনের ‘গণতান্ত্রিক নিরাপত্তা’র প্রতিশ্রুতি বলে প্রতীয়মান হয়েছিল।
একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রথম এবং প্রধান দাবি থাকে— জীবনের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন। বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর জনমনে এই বিশ্বাস জন্মেছিল অরাজকতার যে ‘মব সংস্কৃতি’ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মহীরুহ হয়ে উঠেছিল, তার অবসান ঘটবে। কিন্তু সেটিরও খুব বেশি ফয়সালা হয়নি। এই তিন মাসেও বিভিন্ন জায়গায় মব হয়েছে, ভাঙচুর করা হয়েছে মাজারে। কিন্তু বিএনপি এগুলো নিয়ে খুব বেশি উচ্চবাচ্য করছে না।
নারী ও শিশু নিরাপত্তা এবং হামের প্রাদুর্ভাব
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা ইস্যুতে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত পহেলা জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। ধারণাই করা যায় যে, ধর্ষণের সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
বর্তমানে যে বিষয়টি সরকারকে অনেকখানিই ভোগাচ্ছে তা হলো, হামে শিশুদের মৃত্যু। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ইতোমধ্যে এই হামে আক্রান্ত হয়ে পাঁচশ’র বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাম এবং হামে মৃত্যু নিয়েও প্রতিকারের চেয়েও চলছে দোষারোপের রাজনীতি। যদিও ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের এত বড় গাফিলতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং গণমাধ্যমে প্রতিবাদী হৈ চৈ অব্যাহত থাকলেও এখনও পর্যন্ত বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের তদন্ত কিংবা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তাই জনমনে এই ধারণা পোক্ত হচ্ছে যে, সরকার রাজনৈতিক কারণেই ইউনূস সরকারের বিপক্ষে বা বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান এই মুহূর্তে নিচ্ছে না। যদিও এখন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জরুরি ভিত্তিতে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে সরকার খুব শিগগিরই টিকা দান কর্মসূচি শুরু করবে।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
বারবার অর্থনীতিবিদরা উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রতি মনোযোগ দেওয়ার জন্য সরকারকে তাগাদা দিচ্ছেন। কারণ এটি এখনও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় চাপ তৈরি করছে বলে অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন। তাই জনগণের সামর্থ্যের মধ্যে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের কাছে সেটি সহনীয় করাও এখন পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যাংকের মালিকানা এবং পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তন এবং দখলের রাজনীতিসহ নানা কারণেই ব্যাংকিং খাতে চলছে নানা ধরনের অস্থিরতা এবং এর পাশাপাশি রয়েছে খেলাপিঋণের ভয়াবহ চিত্র।
শিক্ষাঙ্গনে পরিবর্তন ও রাজনৈতিক বিবেচনা
এর পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনেও চলছে নানা ধরনের পরিবর্তন। উপাচার্য নিয়োগে বিশেষ কমিটি তৈরি করা হলেও সেটির কোনো কার্যকারিতা এখনও পর্যন্ত নেই। বরং সরকার কয়েকদিন পর পর একসঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক উপাচার্য নিয়োগ দিচ্ছে এবং সেটির মূল ভিত্তি রাজনৈতিক বিবেচনা। অন্য বিষয়ে বিরোধী দল জামায়াতের ইসলামের সঙ্গে এখনও পর্যন্ত সরকারের বনিবনার তুমুল সমস্যা না হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া জামায়াতের উপাচার্যদের অনেক জায়গা থেকেই সরে যেতে হচ্ছে। যদিও প্রশাসনিকভাবে নিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘সমঝোতা’ চলছে এবং এখনও অনেকটাই জামায়াতনির্ভর। তাই সরকার চলছে অনেকটা ‘মামা-ভাগনে যেখানে আপদ বিপদ নেই সেখান’-এই পদ্ধতিতেই, জনমনে অনেকটাই এই রকম ধারণা।
প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক চাপ
বেশ কয়েক জায়গায় অতিরিক্ত তাড়াহুড়া বিএনপির প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতির ঝোঁকই স্পষ্ট। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ইস্যুতে, যখন ২০২৫ সালের ১১ মে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে ওই অধ্যাদেশ জারি করে পরদিনই এর ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এবং সেটি সরকার গঠনের পর পরই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার অধ্যাদেশটি বিল আকারে সংসদে পাস করে একভাবে এটিকে পোক্ত করেছে। তার সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা বিশেষ দিবস থেকে যেমন বাদ ছিল ৭ মার্চ, সেটিও জারি রেখেছে বিএনপি। শুধু তা-ই নয়, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সবচেয়ে বেশি কার্যকর থাকা সন্ত্রাসবিরোধী আইনও ব্যবহার করছে বিএনপি।
তবে সরকারের কর্মকাণ্ড এবং পদ্ধতিতে বিশ্লেষণে বোঝা যাচ্ছে যে, সরকার বেশ কিছু জায়গায় চরম বেকায়দায় আছে। বিশেষ করে আমেরিকার সঙ্গে করা অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি অনেকটাই গলার কাঁটা হয়েই আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কিচেন কেবিনেটকে এই চুক্তির পেছনে দায়ী করে বিভিন্ন উপদেষ্টা এই চুক্তির সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টহীনতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন। অপরদিকে এনসিপি এখন এই দায় বিএনপির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি ভারতের সাম্প্রতিক নির্বাচন এবং বিশেষ করে কলকাতায় প্রশাসক পরিবর্তন বিএনপিকে নতুন হিসাব-নিকাশের দিকে যেতে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের ফিরে আসা নিয়ে আলোচনা
সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের ফিরে আসা নিয়ে আলোচনা প্রাণ পেলে সেটি নিয়েও যে কিছুটা চাপে আছে সরকার, তা একেবারেই বোঝা যাচ্ছে। এই চাপ শুধু তার একার নয়, এক্ষেত্রে সরকারের ওপর চাপ রাখছে জামায়াত এবং এনসিপি। আন্তর্জাতিক নড়াচড়া এবং দেনদরবারকেও আমলে নিতে হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের দেশের বাইরে সফর, ইউনূস-তারেক বৈঠক, সব কিছুই পরিষ্কার করছে যে, সরকার গঠন করলেও নানামুখী চাপে আছে বিএনপি।



