নির্বাসিত জীবন থেকে শেখ হাসিনা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সব বাধা ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে চলতি বছরই তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ ইমেল সাক্ষাৎকারে তিনি এই ঘোষণা দেন। প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বাইরে থাকা সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ কেবল একটি কাগুজে সংগঠন নয়, এটি একটি ‘শক্তি’। তিনি আরও বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ওপর হামলা।
ফেরার ঘোষণা ও মৃত্যুদণ্ডের রায়
প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার ফেরা কোনও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যুক্ত।’ তিনি অভিযোগ করেন, তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় ‘অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’। তিনি আরও বলেন, ‘আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার বাবা-মা, ভাই এবং প্রায় পুরো পরিবারকে হারিয়েছি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে।’
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি
শেখ হাসিনা দাবি করেন, আওয়ামী লীগ বাংলার মাটিতে প্রোথিত একটি রাজনৈতিক শক্তি। তিনি বলেন, ‘৭৭ বছরের পথচলায় এই দলের ওপর বহুবার আঘাত এসেছে, রক্ত ঝরেছে এবং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই মানুষের শক্তিতে এটি আবার জেগে উঠেছে।’ তিনি বর্তমান সরকারের অধীনে দেশের অর্থনীতি দুর্বল হওয়া, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং চরমপন্থা ছড়ানোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক পুনরুত্থানের সম্ভাবনা
দল নিষিদ্ধ এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা থাকা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনও সরকারের দয়ার ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে জনগণের ওপর।’ তিনি দাবি করেন, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতন সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
শেখ হাসিনা বলেন, ৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সর্বাত্মক আঘাত দেখা গেছে। তিনি আওয়ামী লীগের সময়ের অর্থনৈতিক সাফল্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.২৫ শতাংশ, মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছিল ২ হাজার ৭৯৩ ডলারে। আমরা দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলাম, শতভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছিলাম।’ তিনি পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রজেক্টের কথাও উল্লেখ করেন।
সংখ্যালঘু নির্যাতন ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও গভীর উদ্বেগের।’ তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার এই ঘটনা অস্বীকার করছে বা রাজনৈতিক প্রচার বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সংখ্যালঘুরা কোনও ভোটব্যাংক নয়, তারা সমান মর্যাদার নাগরিক। যারা ধর্মের নামে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করে, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার শত্রু।’
নির্বাসিত জীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
নিজের বর্তমান জীবন সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমার ব্যক্তিগত জীবন বলতে তেমন কিছু নেই। আমি আমার জীবন বাংলাদেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি।’ তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ থাকলেও তার মন পড়ে থাকে বাংলাদেশে। তিনি শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন।



