নরসিংদীতে নিহত বাকপ্রতিবন্ধী ওয়াহিদার কবরে স্বজনদের কান্না, ২৫ বছর পর খোঁজ
নরসিংদীতে নিহত বাকপ্রতিবন্ধী ওয়াহিদার কবরে স্বজনদের কান্না

নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলায় বাকপ্রতিবন্ধী ওয়াহিদা বেগমের (৭০) পরিবারের আরও ১৩ জন সদস্য বগুড়া থেকে তার কবর দেখতে এসেছেন। ২৫ বছর পর খোঁজ পেয়ে রবিবার (১২ জুলাই) বিকালে স্টেশন সংলগ্ন কবরস্থানে ওই নারীর কবর জিয়ারতের সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা।

ওয়াহিদা বেগমের পরিচয় ও হামলার ঘটনা

নিহত ওয়াহিদা বেগম বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা। ওই গ্রামের মৃত রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও মৃত আনিসা বিবি দম্পতির বড় মেয়ে। রেলস্টেশন এলাকার বাসিন্দারা নিহত ওই নারীকে ববি বেগম হিসেবে চিনলেও তার আসল নাম ওয়াহিদা বেগম। ৪ জুলাই দিবাগত রাত ২টার দিকে রেলস্টেশনের পরিত্যক্ত একটি কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তাকে মারধর করে দীর্ঘদিনের জমানো টাকা লুট করে একদল দুর্বৃত্ত। হামলার পর ৭ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। কোনও স্বজন না থাকায় প্রথমে ওই নারীর লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের কথা ভাবা হয়েছিল। তবে স্থানীয় মানুষের অনুরোধে প্রশাসন, পুলিশ ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় স্টেশন সংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

পরিবারের সন্ধান ও কবর জিয়ারত

তার মৃত্যুর খবর ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরে শনিবার দুপুরে কবর জিয়ারত করতে আসেন দুই স্বজন। তারা জানান, ববি বেগমের প্রকৃত নাম ওয়াহিদা বেগম। বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামে। তিনি মৃত রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও মৃত আনিসা বিবি দম্পতির বড় মেয়ে। আট ভাইবোনের মধ্যে সাতজনই বাকপ্রতিবন্ধী। এর মধ্যে ওয়াহিদাসহ তিন জন মারা গেছেন। রবিবার পরিবারের আরও ১৩ জন সদস্য বগুড়া থেকে মাইক্রোবাসে করে বিকাল সাড়ে ৩টায় মেথিকান্দা স্টেশনে এসে পৌঁছান। এরপর ওয়াহিদার কবর জিয়ারত করেন। এ সময় তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্বজনদের মধ্যে ওয়াহিদার তিন বাক প্রতিবন্ধী ভাইবোন উপস্থিত ছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বজনদের বক্তব্য

এত দিন ওয়াহিদার খোঁজ করেননি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়াহিদার ভাগনির স্বামী পরিচয় দিয়ে সৈকত ইসলাম জানান, ২৫ বছর আগে যখন ওয়াহিদা বেগম বাড়ি ছাড়েন, সে সময়ের পরিস্থিতি বুঝতে হবে। তার আট ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় এক ভাই বাদে সবাই বাকপ্রতিবন্ধী। ওই ভাই আশপাশের সব জেলায় ওয়াহিদার খোঁজ করা হয়। তিন বছর খোঁজাখুঁজির পর সন্ধান না পেয়ে হাল ছেড়ে দেন স্বজনরা। পরে বড় ভাই মারা গেলে আর খোঁজ নেওয়ারও কেউ ছিলেন না। তাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন মিলিয়ে ২০ জনই বাকপ্রতিবন্ধী। সৈকত ইসলাম বলেন, ‘২৫ বছর পর তার (ওয়াহিদার) কবরটা হলেও আমরা দেখতে পেরেছি, এটাই শান্তির। মেথিকান্দা স্টেশন ও আশপাশের মানুষের কাছে আমরা খুবই ঋণী, তারা তাকে আগলে রেখেছিলেন।’

ওয়াহিদার জীবনকাহিনি

স্বজনরা জানান, ওয়াহিদার বিয়ের দেড় বছরের মাথায় স্বামীর মৃত্যু হয়। তাদের ঘরে জন্ম নেওয়া একমাত্র মেয়েটিও জন্মের পর পর মারা যায়। তখন খুব একা হয়ে গিয়েছিলেন ওয়াহিদা, বাবার বাড়িতেই থাকছিলেন। ২৫ বছর আগে ছোট বোনের সঙ্গে ঝগড়া করে ওয়াহিদা বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এর আগে প্রায় সময়ই তিনি রাগ করে অন্য বোনের বাড়িতে যেতেন আবার চলে আসতেন। কিন্তু সেদিনের ঝগড়ার পর তিনি আর বাড়িতে ফেরেননি। তাকে কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা মনে করেছিলেন মৃত্যু হয়েছে। ওয়াহিদার ভাগ্নি জামাই সৈকত ইসলাম জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি ফেসবুকে চোখ বোলাচ্ছিলেন, ওই সময় রেলস্টেশনে মারধরে বৃদ্ধ নারীর নিহতের ঘটনাটি তার সামনে আসে। পাশে থাকা স্ত্রীকে ঘটনাটি তিনি দেখান। স্ত্রী সেটি দেখে বলেন, নিহত নারীকে পরিচিত মনে হচ্ছে, তার খালা ওয়াহিদার মতো। পরদিন বাড়িতে সব আত্মীয়-স্বজনদের ছবিটি পাঠানো হলে তারাও নিশ্চিত করেন ববি বেগম আসলে ওয়াহিদা।

প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের বক্তব্য

ভাগনে গোলাম রব্বানী বলেন, ‘আমার মায়ের সঙ্গেই ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়েছিলেন ওয়াহিদা খালা। ভিডিও কল করে বাড়ির সবাইকে খালার কবর তিনি দেখিয়েছি। শেষ পর্যন্ত ২৫ বছর পর খালার খোঁজ পেলাম, তাও মৃত্যুর পর। রবিবার তার ভাইবোনসহ আরও আত্মীয়স্বজন কবর জিয়ারত করতে যাবেন।’ ওয়াহিদাদের প্রতিবেশী এনামুল হক জানান, দরিদ্র পরিবারটির সবাই বাক প্রতিবন্ধী। ২৫ বছর আগে ওয়াহিদা নিখোঁজ হন। এরপর খোঁজখবর করেও সন্ধান পায়নি পরিবার। এত দিন পরিবারসহ প্রতিবেশীরা জানতেন, ওয়াহিদা মারা গেছেন। নরসিংদীতে মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলা ও লুটের শিকার হয়ে খুন হওয়ার পর বিভিন্ন মাধ্যমে তার ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর সেই ছবি দেখে স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাকে চিনতে পারেন।

স্টেশনে ওয়াহিদার জীবন

এদিকে বাড়ি ছেড়ে চলে আসার পর মেথিকান্দা স্টেশনের লোকজন ও আশপাশের মানুষ তাকে ববি বেগম বলে ডাকতে শুরু করেন। তখন থেকেই ওই নামে পরিচিত। স্টেশনের শৌচাগার ও প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দিয়ে এবং চেয়ে যে অর্থ পেতেন তা দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতেন। রাতে স্টেশনের পরিত্যক্ত কক্ষে ঘুমাতেন। রেলওয়ে পুলিশ ও স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, দুই যুগ আগে এক দুপুরে মেথিকান্দা স্টেশনে থামা একটি ট্রেন থেকে নেমেছিলেন ওয়াহিদা। এরপর আর কোথাও যাননি, স্টেশনটির পরিত্যক্ত একটি কক্ষ ছিল তার আশ্রয়। বিনা বেতনে প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া ও শৌচাগার পরিষ্কারসহ বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন। স্টেশন এলাকা ও আশপাশের সবাই তাকে চিনতেন। কেউ খাবার দিতেন, কেউ ৫-১০ টাকা সহযোগিতা করতেন। ওই টাকা খরচ না করে দুই যুগ ধরে জমিয়েছিলেন। সেই টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য ওই নারীর ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।

মামলা ও গ্রেফতার

গত ৪ জুলাই রাত ২টার দিকে মেথিকান্দা স্টেশনের পরিত্যক্ত এক কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা ওয়াহিদাকে মারধর করে দীর্ঘদিনের জমানো টাকা লুট করে নিয়ে যায় একদল দুর্বৃত্ত। হামলার সময় তার চোখ, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত করা হয়। ৭ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। রাত সোয়া ১টার দিকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মেথিকান্দা স্টেশনমাস্টারের দায়ের করা মামলায় এরই মধ্যে পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আজ তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়। ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘গ্রেফতার পাঁচ জনকে আজ দুপুরে আদালতে তুলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল। শুনানি শেষে আসামিদের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক। আজ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে।’