২০২৩ সালের ১২ জুলাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশ থেকে যুগপৎ আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। সমাবেশে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত হয়ে ঐতিহাসিক ‘একদফা’ ঘোষণা করেন। তাঁর বজ্রকণ্ঠের মূল বার্তা ছিল—‘দফা এক, দাবি এক—শেখ হাসিনার পদত্যাগ’।
একদফা ঘোষণার পটভূমি
স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে তিনি দলমত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। বিএনপির এই ঘোষণার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে একই দিনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল ও জোটগুলোও রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে পৃথক সমাবেশ থেকে অভিন্ন একদফার ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে গণতন্ত্র মঞ্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে, ১২ দলীয় জোট বিজয়নগর এলাকায়, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট পুরানা পল্টন এলাকায়, গণফোরাম ও পিপলস পার্টি মতিঝিল এলাকায় এবং জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য সমমনা দলগুলো স্ব স্ব অবস্থান থেকে রাজপথে নেমে আসে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ভিত্তি
জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তেইশের জুলাইয়ের সেই তীব্র গণআন্দোলন ও রাজনৈতিক সংকল্পই মূলত পরবর্তী সময়ে চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের এক মজবুত ভিত্তি তৈরি করেছিল। বাংলাদেশের দীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইতিহাসে ২০০৭ সালের শেষের দিকে ওয়ান-ইলেভেনের জেনারেল মঈন ও ফখরুদ্দিনের মাইনাস-টু ফর্মুলার সরকার গঠনের পর থেকেই বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোর ওপর শুরু হয় চরম নির্যাতন, হামলা ও মামলার এক অন্তহীন অধ্যায়।
দমন-পীড়নের মধ্যেই আন্দোলন
দমন-পীড়নের মধ্যেই ২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশের বর্বর হামলা, ভাঙচুর ও গণগ্রেফতার চালানো হয় এবং পরদিন গভীর রাতে গুলশানের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে সব ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ১০ ডিসেম্বর ঢাকার গোলাপবাগ মাঠের ঐতিহাসিক বিভাগীয় মহাসমাবেশ থেকে প্রধান অতিথি ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সরকারের পতন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ঐতিহাসিক ‘১০ দফা’ আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন, যা যুগপৎ আন্দোলনের এক শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলে।
১২ জুলাইয়ের অগ্নিঝরা দুপুর
সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের পুরো জুলাই মাসজুড়ে বিএনপির প্রতিটি কর্মসূচিতে সরকারি পুলিশ বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলা, পাল্টা কর্মসূচি এবং নিষ্ঠুরতম নিপীড়ন চালানো হয়। তেইশের জুলাইয়ের তেমনই এক ভয়াল, অগ্নিঝরা দুপুরে আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা আর চারদিকের চরম প্রতিকূলতার মাঝে নয়াপল্টনের মহাসমাবেশে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। সেদিন দেশের তরুণ সমাজের কাছে তারুণ্যের প্রতীক এবং স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের রক্ত ও নীতির যোগ্য উত্তরসূরি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভাষণ প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে প্রকম্পিত মাইকে বেজে ওঠে। তাঁর সেই অকুতোভয় ও বজ্রকণ্ঠের দিকনির্দেশনা লাখো জনতার ভেতরের সব ভয়কে জয় করে এক অদম্য সাহসের জন্ম দিয়েছিল এবং পুরো নয়াপল্টন ময়দানকে এক ঐতিহাসিক গণজোয়ারে কাঁপিয়ে তুলেছিল।
জনতার আবেগ ও স্বপ্ন
সেদিন নয়াপল্টনের সেই অগ্নিঝরা দুপুরে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও চরম আবেগে ফেটে পড়েছিল উত্তাল লাখো জনতা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অকুতোভয় বক্তব্য শুনে স্বৈরাচারের পতন এবং গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর লাখো মানুষের চোখ গড়িয়ে জল নেমে এসেছিল।
অবিস্মরণীয় দিন
আজ অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের অভূতপূর্ব জৌলুসের আড়ালে কি তেইশের জুলাইয়ের সেই সুকঠিন ও রক্তঝরা গণআন্দোলন হারিয়ে গেছে? কিন্তু বাস্তবতা হলো, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের স্বপ্নে পাগলপারা জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলো কোনোভাবেই ভুলে যাওয়ার নয়। শত শত বাধা, নিপীড়ন ও বুলেটের ভয় উপেক্ষা করে রাজপথে গড়ে ওঠা সেই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দুটি দিন ছিল একেকটি মহাসমুদ্রের মতো— একটি ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ এবং অন্যটি ২০২৩ সালের ১২ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক গণজোয়ার।
দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল
দীর্ঘ ১৭ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে রাজপথে বিএনপির নেতাকর্মীদের ত্যাগ ও আত্মত্যাগের চূড়ান্ত ফসল এই ১২ জুলাই। এদিন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মুখ থেকে আসা সেই ঐতিহাসিক ‘একদফা’ ঘোষণা আজ দলের প্রতিটি নেতাকর্মী ও গণতন্ত্রকামী মানুষের হৃদয়ে চিরকাল এক অনন্য প্রেরণা ও অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।



