চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ (29.06.2026)

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি মালয়েশিয়া হয়ে চীন সফর শেষে দেশে ফিরেছেন। শুক্রবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। এই সফরকে ঘিরে বাংলাদেশের জনমনে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা ছিল, বিশেষ করে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে। সফর শেষে দুই সরকারের যৌথ সম্মতিতে একটি যৌথ বিবৃতিও প্রকাশিত হয়েছে।

সফরের ইতিবাচক দিক ও সম্ভাবনা

এই সফরের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে বর্তমান সরকারের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেছে, যা ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে। এতে চীন ও চীনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে, ফলে তারা আরও আগ্রহের সঙ্গে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসবেন। বিনিয়োগের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য, যা বর্তমান সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। আলোচনায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মোংলা বন্দর নিয়ে যৌথ কার্যক্রমের প্রস্তাবনা উঠে এসেছে, যার মাধ্যমে বিনিয়োগ আসতে পারে। তবে এ দুটি বিষয়ে চুক্তি না হওয়ায় বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বাংলাদেশ কীভাবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখে তার ওপর।

বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর

সফরে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাবনা এসেছে, যা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমূল বদলে দিতে পারে। এর আগে মানবিক করিডরের আলোচনা ছিল, যা রোহিঙ্গাদের জন্য সাহায্য সরবরাহের উদ্দেশ্যে। এখন যদি মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডর তৈরির আলোচনা চলে, তাহলে সরকারকে সাহসী ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে এই ধরনের করিডরের আলোচনা নতুন নয়; ২০১৩ সালে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) করিডর নিয়ে নীতিগত সম্মতি হলেও ভারত-চীন সম্পর্কের অবনতির কারণে তা এগোয়নি। বর্তমানে নতুন করিডর নিয়ে আলোচনা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করতে পারে, যা এড়ানোই হবে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির সাফল্য।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রোহিঙ্গা সংকটে চীনের ভূমিকা

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে রাজি আছেন। তবে এটি নতুন নয়; ২০২১ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় সংলাপের প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল। এখন সেই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন, যা বিগত নয় বছরে দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রোহিঙ্গা সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে, প্রায় দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং তহবিলের চরম সংকট রয়েছে।

পানি সম্পদ ও তিস্তা প্রকল্প

উভয় দেশ সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদীর পানিপ্রবাহের পূর্বাভাস ও তথ্য বিনিময়, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং নদী খননের ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করতে একমত হয়েছে। প্রধান বিষয় হিসেবে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প এবং সামুদ্রিক বিষয়াবলি (সুনীল অর্থনীতি) গুরুত্ব পেয়েছে। তিস্তা প্রকল্প উত্তরবঙ্গের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখবে, আর সুনীল অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্য অনাবিষ্কৃত একটি খাত।

শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা কার্যক্রমের সহযোগিতা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমঝোতা হলে কার্যক্রম আরও সুনির্দিষ্ট ও ফলাফলকেন্দ্রিক হয়। বিএনপি সরকার কারিগরি শিক্ষার দিকে মনোযোগী, তাই এ বিষয়ে চীনের সহযোগিতায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব।

বাণিজ্য ঘাটতি ও রপ্তানি সম্ভাবনা

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা কমানোর কাজ করতে হবে। চীন শুল্কমুক্ত পণ্য রপ্তানির সুবিধা দিলেও বাংলাদেশ তা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছে না। চীনের বাজারে চাহিদা রয়েছে এমন পণ্য যেমন গার্মেন্টস, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সি ফুড, কাঁঠাল ইত্যাদির রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে একটি পণ্যের পরিবর্তে রপ্তানি বাজারকে বিস্তৃত করতে হবে।

ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ও চ্যালেঞ্জ

প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ভারতের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ও বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্প বাস্তবায়নে পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য বজায় রাখা। ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হলেও বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় তা টিকিয়ে রাখা কঠিন। তাই জটিল প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে যথেষ্ট ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে শুধু জটিলতার কারণে দেশের স্বার্থের প্রকল্প না নেওয়াও বোকামি। বিএনপি সরকারের 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতি অনুসরণ করা যেতে পারে।