বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এখন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বে: মাহদী আমিন
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বে

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বে পরিণত হয়েছে। শুক্রবার চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় (বাংলাদেশ সময় বেলা ১২টায়) সেন্ট্রাল বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

বহুমাত্রিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

মাহদী আমিন বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে একটা দীর্ঘমেয়াদী, কৌশলগত, অংশীদারিত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যার ভিত্তিতে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পেরিয়ে বহুমাত্রিক সম্পর্কে রূপ নিয়েছে।’ এই স্বল্প সময়ে প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং ও ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনপিসি) স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘অত্যন্ত উচ্চস্তরের প্রতিনিধি দলে বাংলাদেশ এবং চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয় নিয়ে সব স্তরে আলোচনা করা হয়েছে। যেখানে নির্ধারিত হয়েছে, এই ঐতিহাসিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হবে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান, সহযোগিতা এবং অবশ্যই দুদেশের নিজস্ব স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ভূমিকার প্রশংসা

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, চীনের নেতারা বাংলাদেশ ও চীনের ৫০ বছরের সম্পর্ক স্থাপনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অসাধারণ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ‘চীনের প্রত্যেকে বাংলাদেশ এবং চীনের সম্পর্কের দিক থেকে আজকে যে অবস্থানে রয়েছে তার পেছনে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেভাবে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিভিন্ন সময় ফ্যাসিলিটেট করেছেন, পলিসি দিয়েছেন, বারবার রাষ্ট্রীয় সফর করেছেন সেগুলোকে উনারা এপ্রিশিয়েট করেছেন।’

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী আবারও ‘ওয়ান পলিসি, ওয়ান চায়না’ নীতি নিশ্চিত করেছেন, অর্থাৎ চীনকে একটি একক রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয়, যার মধ্যে তাইওয়ান অন্তর্ভুক্ত।

জন-কেন্দ্রিক নীতিতে চীনের সহযোগিতার আশ্বাস

মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর গত চার মাসে তার জন-কেন্দ্রিক নীতি ও দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য চীনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ‘জনগণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেক্টরে এ পলিসিগুলো বাস্তবায়নের জন্য যেখানে যতটুকু করা প্রয়োজন চীন বাংলাদেশের পাশে থাকবে।’

বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান

চীনের ফ্যাক্টরি রিলোকেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চীনের নেতৃত্ব বলেছে রিলোকেশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কিভাবে প্রাধান্য দেওয়া যায়। যেসব জায়গায় বাংলাদেশের হিউম্যান রিসোর্স রয়েছে, টেকনিক্যাল ক্যাপাসিটি রয়েছে, সেই ইন্ডাস্ট্রিগুলো বাংলাদেশে নিয়ে আমরা কিভাবে জব ক্রিয়েট করতে পারি এগুলো নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।’ চীন থেকে আসা বিনিয়োগে কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা

চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যাপ্তি বাড়ানোর কথা উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, ‘সড়ক, ব্রিজ, রেলওয়ে—চীন আমাদেরকে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশন মেকানিজমের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে চায়।’ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন, যা দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া মংলা ইকোনমিক জোন, গ্রিন এনার্জি ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে চায় চীন।

বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে চীন পাশে থাকতে চায় বলেও জানান তিনি।

তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহায়তা

তিস্তা প্রকল্প প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, ‘তিস্তা প্রজেক্টের বিষয়ে আমাদের মহাপরিকল্পনা রয়েছে, যা বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত ছিল।’ প্ল্যানিং, ফিজিবিলিটি স্টাডি ও টেকনিক্যাল সাপোর্টে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়। ‘এই মহাপরিকল্পনার প্ল্যানিং স্টেজ থেকে শুরু করে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে টেকনিক্যাল সাপোর্ট প্রোভাইড করা, তার উপর ভিত্তি করে আমাদের প্রজেক্ট ডিজাইন করা, প্ল্যানিং, এক্সিকিউশন সব জায়গাতে ধারাবাহিকভাবে চীন সরকার যুক্ত হবেন বলে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।’

ইকোনমিক করিডর ও বন্দর উন্নয়ন

বাংলাদেশ ও চীন হয়ে একটি ইকোনমিক করিডর তৈরির প্রস্তাব এসেছে, যার মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো। চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিক করে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি মংলা বন্দরকে আরও সেবামুখী করতে চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক

মাহদী আমিন বলেন, ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষা ব্যবস্থা, যেমন ইতোমধ্যে তৃতীয় ভাষা হিসেবে ম্যান্ডারিনকে প্রাইরিটাইজ করা হচ্ছে, টেকনিক্যাল এবং ভোকেশনাল এডুকেশনকে প্রায়রিটাইজ করা হচ্ছে এবং এই দুই ক্ষেত্রেই চীন তার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে চায়।’ চীনা ভাষা শিক্ষায় শিক্ষক ও অবকাঠামো সহায়তা দেওয়া হবে।

স্বাস্থ্যখাতে রোবটিক সার্জারি ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশিদের চীনে চিকিৎসার জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের সহায়তা

রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, ‘আমরা চাই সেফ ভলান্টারি এবং ডিগনিফাইড ওয়েতে যারা আমাদের দেশে রোহিঙ্গা রয়েছেন, উনারা নিজ দেশে ফেরত যাক।’ চীন মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপে ফ্যাসিলিটেট করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তিনি স্মরণ করেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সময়ই কেবল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়েছিল।

প্রতিরক্ষা ও কূটনীতিতে ‘টু প্লাস টু’ সমঝোতা

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘টু প্লাস টু’ সমঝোতা হয়েছে। মাহদী আমিন বলেন, ‘যেখানে দুই দেশের ফরেন মিনিস্ট্রি এবং ডিফেন্স মিনিস্ট্রি থেকে রিপ্রেজেন্টেটিভ যারা রয়েছেন উনাদের নিয়মিত আলোচনার ভিত্তিতে সামনের দিনগুলোতে ডায়লগ শুরু হবে।’ চীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান জানিয়েছে।

বহুপাক্ষিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় বাংলাদেশের নির্বাচনে চীন সহযোগিতা করেছে। ব্রিকসে সদস্যপদের জন্য বাংলাদেশের আবেদনকে চীন স্বাগত জানাবে বলেও জানান মাহদী আমিন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি ও সুজন মাহমুদ, সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হকসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।