মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রেখেই বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি (এমপিএস) ঘোষণা করছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হচ্ছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের অধীনে এটিই হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রথম মুদ্রানীতি।

মুদ্রানীতি কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

প্রতি বছর দুইবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একবার বছরের শুরুতে জানুয়ারিতে, আরেকবার জুলাই মাসে। মুদ্রানীতি দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মুদ্রানীতির আরেকটি কাজ হলো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা।

বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে খোলাবাজার কার্যক্রম, সংবিধিবদ্ধ জমার অনুপাত পরিবর্তনসহ ব্যাংক হার পরিবর্তনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। সাধারণত মুদ্রার গতিবিধি প্রক্ষেপণ করে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য ও প্রভাব

অর্থনীতির ভাষায়, মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য দুটি: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে গেলে মুদ্রাস্ফীতি হয়, যা মুদ্রার মান কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ বাড়ানো হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. জায়েদ বখত বলেন, “মুদ্রানীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি খাতে কতটুকু ঋণ বিতরণ করা হবে তা মুদ্রানীতির মাধ্যমে নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আবার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।” তিনি আরও বলেন, “প্রবৃদ্ধি বাড়লে সাধারণ মানুষের আয় রোজগার বাড়বে। অপরদিকে মূল্যস্ফীতি যদি বেশি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ব্যয় বেড়ে যাবে।”

মুদ্রানীতির সরঞ্জাম ও কার্যপদ্ধতি

বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতির বেশ কয়েকটি ‘টুল’ বা যন্ত্র দিয়ে মুদ্রা সরবরাহ (মানি সাপ্লাই) নিয়ন্ত্রণ করে, যার ওপর নির্ভর করে ‘মূল্যস্ফীতি’। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত রেপো ও রিভার্স রেপো রেটের মাধ্যমে বাজারে সুদের হারের সংকেত পাঠায়। তবে বেশ কিছুদিন ধরে রেপো বা রিভার্স রেপোতে কোনো পরিবর্তন করা হচ্ছে না, ফলে এই দুটি হাতিয়ার অকার্যকর রয়েছে।

মুদ্রা সরবরাহের মধ্যে হাতের টাকা (কারেন্সি ইন সার্কুলেশন) এবং ব্যাংকে জমা আমানত (ডিমান্ড ও টাইম ডিপোজিট) অন্তর্ভুক্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করে।

মুদ্রানীতির সীমাবদ্ধতা ও অন্যান্য নীতির প্রয়োজনীয়তা

সব সময় মুদ্রানীতি ঠিকমতো কাজ করে না; অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়। জিডিপির প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বিনিয়োগের উচ্চ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যার জন্য ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে হয়। এতে ব্যক্তিখাতের ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়, কিন্তু মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে।

অনেকে মনে করেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেশি হলেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেশি হবে। তবে এ কথার সঠিক ভিত্তি নেই। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ শতাংশের ঘরে, অথচ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। আবার ২০১০-১১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের হার ছিল ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ, কিন্তু জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছিল মাত্র সাড়ে ছয় শতাংশ হারে।

এ জন্য মুদ্রানীতির পাশাপাশি সরকারের রাজস্বনীতি (ফিসক্যাল পলিসি) ও বাণিজ্যনীতি (ট্রেড-ইমপোর্ট ও এক্সপোর্ট পলিসি) একই উদ্দেশ্যে কাজ না করলে, বিশেষ করে ঋণের টাকার সদ্ব্যবহার না হলে ফল লাভ করা যায় না।

ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গি

রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, “মুদ্রানীতির মাধ্যমে ঋণের ব্যবস্থা হলেও বিদ্যুৎ, গ্যাস, অবকাঠামোগত সুবিধা যখন থাকে না তখন মুদ্রানীতির উদ্দেশ্য সফল হয় না। এখনও বিদ্যুৎ, গ্যাস, অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছেই। এসব সমস্যার সমাধান না করে শুধু ঋণের ব্যবস্থা করে বিনিয়োগও বাড়ানো যাবে না।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে মুদ্রানীতির তত্ত্ব সব সময় কার্যকর হয় না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় কাঠামোগত সংস্কার ও অন্যান্য নীতির সমন্বয় প্রয়োজন।