ময়মনসিংহে মুরগির বিষ্ঠার দখল নিয়ে সংঘর্ষ: জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলা-লুটপাটের অভিযোগ
মুরগির বিষ্ঠা নিয়ে সংঘর্ষে ময়মনসিংহে হামলা-লুটপাট

ময়মনসিংহে মুরগির বিষ্ঠার দখল নিয়ে সংঘর্ষ: জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলা-লুটপাটের অভিযোগ

ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় মুরগির বিষ্ঠার ভাগ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গত মঙ্গলবার মধ্যরাতের দিকে উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের কাহালগাঁও বাজারে সংঘটিত এই হামলায় হাতবোমা বিস্ফোরণ, ব্যাংকের তালা ভেঙে টাকা লুট, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

মামলা ও গ্রেপ্তার

এ ঘটনায় বুধবার (৮ এপ্রিল) জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৪৮ জনের নাম দিয়ে এবং অজ্ঞাত আরও ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার তথ্য দিয়েছেন ফুলবাড়ীয়া থানার এস আই লিটন। তিনি জানান, বুধবার রাতে উপজেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম তালুকদার বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এ ঘটনায় আটক চারজনকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর হামলাকারীদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

দ্বন্দ্বের পটভূমি

প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এবং মামলার তথ্যে জানা গেছে, কাহালগাঁও বাজারের পাশে দীর্ঘদিন ধরে সিপি বাংলাদেশ-৫ কোম্পানিতে লেয়ার মুরগি লালন-পালন করা হচ্ছে। ওই কোম্পানির মুরগির বিষ্ঠা আওয়ামী লীগের সময় তাদের নেতাকর্মীরা বিনামূল্যে নিয়ে বিক্রি করতেন। আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা বিষ্ঠা নিতেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়ীয়া) আসনে জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ কামরুল হাসান মিলন জয়লাভ করেন। এরপর সেখানার মুরগির বিষ্ঠা কারা নেবেন তা নিয়ে স্থানীয় জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হামলার বিবরণ

এ ঘটনার জেরে মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে বাস, অটোরিকশা ও মাহিন্দ্রা করে দুই শতাধিক জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী সিপি বাংলাদেশ কোম্পানিতে যায়। তারা সেখান থেকে দুই ট্রাক মুরগির বিষ্ঠা নিয়ে যায়। পরে কাহালগাঁও বাজারে ডুকে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এ সময় বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট এবং যানবাহন ভাঙচুরের অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

কাহালগাঁও বাজারের ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ব্যবস্থাপক মো. শামীম হক বলেন, ‘আমি মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে ব্যাংকে তালা বন্ধ করে যাই। রাত ১১টার দিকে জামায়াতের অন্তত ২০০ নেতাকর্মী বাজারে হামলা চালায়। এ সময় আমার ব্যাংকের তালা ভেঙে পাঁচ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।’

গাজী কোম্পানির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে দুই লাখ সাত হাজার টাকা লুট করা হয়েছে বলে কোম্পানির এক্সিকিউটিভ সুজন মিয়া অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘রাতে হঠাৎ জামায়াতের নেতাকর্মীরা হামলা করে। হামলায় আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও ভাঙচুর করা হয়।’

কাহালগাঁও বাজারের ইজারাদার আমিমুল ইসলাম বলেন, ‘হামলার সময় আমি বাজারে ছিলাম। হঠাৎ জামায়াতের নেতাকর্মী হামলা ও ভাঙচুর করে। এ সময় আমার ডিসকভার ১২৫ সিসি মোটরসাইকেল লুট করে নিয়ে গেছে।’

কোম্পানির বক্তব্য

এ বিষয়ে সিপি বাংলাদেশ কোম্পানির ব্যবস্থাপক সাদিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা মুরগির বিষ্ঠা বিনামূল্যে দিয়ে দেই। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাদের নেতাকর্মীরা মুরগির বিষ্ঠা নিতেন। আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপি নেতাকর্মীরা বিষ্ঠা নিত। কিন্তু নির্বাচনের পর থেকে বিষ্ঠা নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব চলে আসছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ কামরুল হাসান মিলন আমাকে একদিন ফোন করেছিলেন। তিনি বলেন, বিষ্ঠা যেন জামায়াতের নেতাকর্মীদের দেওয়া হয়। এ নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব চলে আসছে। বিষয়টি আমি ফুলবাড়িয়া থানা পুলিশকে অবগত করেছি।’

প্রতি দেড় মাসে ছয়টি শেড থেকে প্রায় আট লাখ টাকার বিষ্ঠা উৎপাদন হয় বলে জানান ব্যবস্থাপক। তিনি বলেন, এটি দিয়ে সাধারণত মাছের খাবারসহ অন্যান্য জিনিস তৈরি হয়।

জামায়াতের প্রতিক্রিয়া

‘লুটপাটে জামায়াত জড়িত নয়’ এ বিষয়ে ফুলবাড়ীয়ার সংসদ সদস্য কামরুল হাসান মিলন বুধবার রাতে বলেন, ‘সংসদ অধিবেশনের জন্য ঢাকায় আছি। তবে এলাকার এই ঘটনা শুনেছি। মূলত বিএনপির দুটি পক্ষ এবং জামায়াতের কয়েকজন নেতাকর্মী এর সঙ্গে যুক্ত আছে বলে জানতে পেরেছি। কিন্তু যে বা যারাই এই ঘটনা ঘটাক তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে।’

এদিকে বুধবার ফুলবাড়ীয়া উপজেলা জামায়াতের আমির মো. ফজলুল হক শামীম ও সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। কাহালগাঁও বাজারে হামলা বা লুটপাটের ঘটনায় জামায়াত জড়িত নয় দাবি করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘এই হীন সন্ত্রাসী ঘটনায় আমরা দলীয়ভাবে উপজেলা জামায়াতের শুরা ও কর্মপরিষদ সদস্য মো. আ. মজিদকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত প্রতিবেদন ৭২ ঘণ্টার মাঝে জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে জামায়াতের কোনো নেতাকর্মী জড়িত থাকলে সাংগঠনিক ও আইনগত সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

বিএনপির প্রতিবাদ

হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় কাহালগাঁও বাজারে বিএনপি এবং স্থানীয়দের ব্যানারে বুধবার বিকালে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আখতারুল আলম ফারুক বলেন, ‘এটি একটি সন্ত্রাসী ও ডাকাতি কার্যক্রম। জামায়াত যে একটি সন্ত্রাসী দল, এ ঘটনায় আবারও তা প্রমাণ হলো। বিএনপির পক্ষ থেকে এ ঘটনায় জড়িত সব সন্ত্রাসীকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’

স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে, এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।