ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগ অফিসের তিন দোকান গোপনে বিক্রির অভিযোগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম এখন কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে দলীয় অফিস পুনরায় চালুর উদ্যোগ দেখা গেলেও এ জেলায় ভিন্ন চিত্র মিলছে। গোপনে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দলীয় অফিস হিসেবে কেনা তিনটি দোকান ঘরের বিরুদ্ধে।
দলীয় সূত্রে বিক্রির কারণ
দলীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মামলা-মোকদ্দমার ব্যয় নির্বাহ এবং কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের সহায়তার জন্য জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও সংশ্লিষ্ট নেতারা সরাসরি অফিস বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
সরকার পতনের পরের পরিস্থিতি
সরকার পতনের পরপরই জেলার আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতারা আত্মগোপনে চলে যান। দলটির মন্ত্রী, সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। পরে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলে পুরো সংগঠন কার্যত নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।
দলীয় সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের পর জেলা পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়। কেউ কারও খোঁজখবর রাখেননি। এর মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিসহ কয়েকজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন।
দোকানগুলোর ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
শহরের মৌলভীপাড়ায় অবস্থিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের সমবায় মার্কেটের প্রথম তলায় ২০১৮ সালের ২৪ মে তিনটি দোকান ঘর বরাদ্দ নেওয়া হয়। তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রতিটি দোকানের জন্য প্রায় ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৫০ টাকা করে পরিশোধ করা হয়েছিল।
দলীয় কার্যালয় স্থাপনের উদ্দেশ্যে এ দোকানঘরগুলো কেনা হলেও বর্তমানে সেখানে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। সরেজমিন দেখা যায়, ওই তিনটি দোকানে স্টুডেন্ট গার্মেন্টস, বিশাল শুটিং সেন্টার ও স্টার টেইলার্স প্রাইভেট লিমিটেড নামে ব্যবসা চলছে।
বিক্রির অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগে শহরের এক ব্যবসায়ীর মধ্যস্থতায় দোকান তিনটি প্রায় ৬৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। সদর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের এক ব্যক্তি এসব দোকান কিনেছেন বলে জানা গেছে। লেনদেনের টাকা জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে স্টার টেইলার্স-এর মালিক সালাম চৌধুরী দাবি করেন, তিনি পাঁচ বছর আগে প্রয়াত আল মামুন সরকারের কাছ থেকে দোকানগুলো কিনেছেন এবং তার কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে।
জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম খোকন বলেন, দোকান বিক্রির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন জানান, ঢাকায় একটি বৈঠকে এ বিষয়ে রেজুলেশন করা হয়েছে।
ব্যাংকের বক্তব্য ও স্থানীয় ক্ষোভ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বলেন, দোকানগুলো দলীয় নামেই বরাদ্দ রয়েছে। মালিকানা পরিবর্তনের জন্য ব্যাংকের অনুমোদন, নির্ধারিত ফি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর প্রয়োজন। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। ফলে এ ধরনের কোনো দলীয় অফিস বিক্রির খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার পতনের পর নেতাদের কেউ কারো খোঁজ নেয়নি। জেলে থাকা নেতাকর্মীদের জন্য একটি বিবৃতিও দেওয়া হয়নি। সংগঠন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।
মামলার পরিসংখ্যান
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জেলায় অন্তত ১৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি ১ হাজার ৩৬২ জন এবং অজ্ঞাত আসামি ২৩ হাজার ৬৪০ জন।
তবে দলীয় নেতাদের দাবি, বাস্তবে মামলার সংখ্যা আরও বেশি এবং মোট ৪৬টি মামলায় প্রায় ৪ হাজার ৮৮০ জন নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে।



