গণভোট রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজধানীতে ১১ দলীয় ঐক্যের বিক্ষোভ সমাবেশ
গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি অবস্থানের প্রতিবাদ ও তা অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। শনিবার (৪ এপ্রিল) বিকালে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেইটে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলকে কেন্দ্র করে দুপুরের পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতা-কর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে জড়ো হতে থাকেন।
এ সময় তাদের হাতে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চাই’, ‘গণভোট মানতে হবে’—এমন নানা দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। নেতাকর্মীরা গণভোটের পক্ষে ও সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বায়তুল মোকাররম উত্তর গেইট থেকে বের হয়ে নাইটিঙ্গেল মোড় হয়ে কাকরাইলে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় হাজার-হাজার মানুষ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি তুলে ধরেন।
নেতাদের বক্তব্য: সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, “আজকের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ পুরো মন্ত্রীসভা, এমনকি সংসদ সদস্যরা জুলাই বিপ্লবের কারণে নির্বাচিত হয়েছেন। এক দলকে বিদায় করে আরেক দলকে ক্ষমতায় বসাতে জুলাই বিপ্লব হয়নি। জুলাই বিপ্লব হয়েছে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার জন্য রচিত বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর পরিবর্তনের জন্য। এ জন্যই সংবিধান সংস্কার করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও বিএনপি সময় থাকতে সহজে মেনে নেয়নি। অনেক রক্তের বিনিময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করতে বিএনপি সরকারকে বাধ্য করা হয়েছে। আজও সময় থাকতে সহজে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে বিএনপিকে বাধ্য করা হবে। রাজপথের আন্দোলন সরকারের জন্য সুফল আনে না।”
বিএনপির অবস্থান নিয়ে সমালোচনা
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে যেসব অধ্যাদেশ সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে সেগুলো বিএনপি সরকারের খুব পছন্দ। কিন্তু, যেই অধ্যাদেশগুলো জনগণের কাছে সরকারকে জবাবদিহিতে বাধ্য করে সেগুলো তাদের খুবই অপছন্দ। এ জন্য বিএনপি বাছাই করে সেই অধ্যাদেশগুলো বাতিল করার পথে হাঁটছে। বিএনপির রাজনীতি একদিকে সুবিধাবাদী আরেকদিকে মুনাফেকি। তারা মুখে এক কথা বলে, কাজে আরেকটা করে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশবাসীকে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু সরকার গঠনের পর গণভোটের রায় তারা মেনে নিচ্ছে না। ৭০ শতাংশ জনগণের বিপক্ষে গিয়ে ক্ষমতায় টিকতে পারবেন না।”
সংবিধান ও গণভোটের গুরুত্ব
এনসিপি’র সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য বৈধ হলেও জনগণের ভোটে গণভোট জয়যুক্ত হওয়ার পর বিএনপি সেটাকে বলে অবৈধ। বিএনপি নির্বাচনের আগে গণভোটের বিপক্ষে কথা না বললেও সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য বিএনপির হওয়ায় তারা জনগণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশ পরিচালনার জন্য অবশ্যই সংবিধান লাগবে। কিন্তু সেই সংবিধান মুজিববাদের সংবিধান নয়, শেখ হাসিনার সংবিধান নয় বা বিএনপির মনগড়া সংবিধান নয়। সংবিধান হতে হবে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। গণভোট মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে দলীয়করণ বন্ধ হবে, একনায়কতন্ত্র বন্ধ হবে, সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন হবে। এ জন্যই বিএনপি গণভোট মানে না।”
জনগণের শক্তির প্রতি আহ্বান
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমীর মুফতি মোখলেছুর রহমান কাসেমী বলেন, “যারা জনগণের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে তাদেরকে ছাত্র-জনতা মাত্র ৩৬ দিনে ১৭ বছরের ক্ষমতার মসনদ ভেঙে দিয়েছে। আজকে যারা গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না তাদেরকে ৩৬ দিন নয় ৩৬ ঘণ্টায় বিতাড়িত করতে পারে এদেশের ছাত্র-জনতা।”
এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. ওমর ফারুক বলেন, “গণভোটের রায় মেনে না নেওয়ার অর্থ হচ্ছে ফ্যাসিজম প্রতিষ্ঠা করা। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জাতিকে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে এখন জনরায় মেনে নিচ্ছে না। কীভাবে জনরায় বাস্তবায়ন করা লাগে জনগণ সেটি ভালো করেই জানে। সোজা পথে না আসলে জনগণ দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।”
এই সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা সরকারের কাছে গণভোটের রায় মেনে নেওয়া ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জোরালো দাবি জানান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন আগামী দিনে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।



