ওয়ান-ইলেভেনের মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেফতার: মাইনাস টু ফর্মুলার ষড়যন্ত্রের নতুন তথ্য
ওয়ান-ইলেভেনের মাসুদ চৌধুরী গ্রেফতার, মাইনাস টু ফর্মুলার ষড়যন্ত্র

ওয়ান-ইলেভেনের মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেফতার: মাইনাস টু ফর্মুলার ষড়যন্ত্রের নতুন তথ্য

প্রায় ১৯ বছর আগে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশি-বিদেশি নানা প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে গঠিত হয় ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেনা-সমর্থিত এই প্রশাসন ‘ওয়ান-ইলেভেন’ বা ‘১/১১ সরকার’ নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকা এ সরকারের সময় রাজনৈতিক সংস্কারের নামে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল— আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে বাদ দেওয়ার এই উদ্যোগ ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ নামে আলোচিত হয়। এ প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনীর কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা ও সিভিল সোসাইটির কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ

বর্তমানে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে লেফটেন্যান্ট জেনারেল অব মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতারের পর। গত ২৩ মার্চ দিবাগত রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস-এর বাসা থেকে তাকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। পরদিন ২৪ মার্চ তাকে আদালতের মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের হেফাজতে নেয় গোয়েন্দা পুলিশ। একদিন পর তার জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরেই ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মামুন খালেদকে গ্রেফতার করা হয়। আরও অনেকেই গ্রেফতারের তালিকায় রয়েছেন বলে গোয়েন্দা সূত্র জানায়। যদিও বেশিরভাগ দেশের বাইরে রয়েছেন। কেউ কেউ মারাও গেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম কুশীলব হিসেবে পরিচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে একটি প্রতারণার মামলায় দ্বিতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রবিবার (২৯ মার্চ) ছয় দিনের হেফাজতে নিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। প্রথম দফায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে আরও কয়েকজনের নাম প্রকাশ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ পর্যন্ত মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঢাকা ও ফেনীতে ১১টি মামলার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ওয়ান-ইভেলেনের কোনও ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে সেটাও তদন্ত করে দেখবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মাইনাস টু ফর্মুলার পেছনের ষড়যন্ত্র

প্রথম দফায় গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী নিজেকে নির্দোষ হিসেবে তুলে ধরেন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে। ১/১১ এর ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ ও ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন তিন প্রভাবশালী কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারসহ অনেকের নাম বলেছেন। তার মতে, এরা মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়ন এবং কিংস পার্টি গঠনে কাজ করেছেন। যার মূল হোতা ছিলেন এটিএম আমিন। যদিও ওয়ান-ইলেভেনের শুরু থেকেই জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর দোর্দণ্ড প্রতাপ সবার নজর কেড়েছিল। তখন তিনি ‘গুরুতর অপরাধ দমন অভিযান সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র প্রধান সমন্বয়ক। যে কমিটি বড় বড় দুর্নীতিবাজকে বিচারের সম্মুখীন করতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর আপন ভায়রা ভাই ছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার আপন ছোট ভাই মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দার। ওয়ান-ইলেভেনের নেপথ্যে তিনিও কলকাঠি নেড়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের বর্ণনা

তখনকার সেনা প্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ অবসরে যাওয়ার পর তার স্মৃতিচারণ নিয়ে লেখা শান্তির স্বপ্নে বইয়ে লিখেছেন, তিন বাহিনীর প্রধান, সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের পিএসও এবং ডিজিএফআইয়ের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের সেই পিএসও ছিলেন সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.)। মাইনাস টু ফর্মুলার বিষয়টি অস্বীকার করে লেখক মহিউদ্দিন আহমদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মইন উ বলেছিলেন, ‘মাইনাস টু’ শব্দটি মিডিয়ার তৈরি। তখন নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন ভাইস অ্যাডমিরাল সরওয়ার জাহান নিজাম। তিনি ১/১১ এর একদিন আগে ২০০৭ সালের ১০ জানুয়ারি নৌবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। একই সময়ে বিমান বাহিনীর প্রধান ছিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল ফখরুল আজম।

মইন উ আহমেদ বঙ্গভবনে যাওয়ার আগে তখনকার চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) ইকবাল করিম ভূঁইয়ার নাম উল্লেখ করে নিজের লেখা বইয়ে বলেছেন, ‘‘সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে আমার শেষ যাত্রা কিংবা কে জানে হয়তো জীবনের শেষযাত্রা। বঙ্গভবনে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে আমি সিজিএস মেজর জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে ডেকে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করলাম। আমি ফিরে না আসলে পরবর্তী পরিস্থিতি সিজিএস হিসেবে প্রাথমিকভাবে তাকেই সামলাতে হবে। আমি সিজিএসকে বললাম, প্রেসিডেন্ট যদি আমাদের সুপারিশ মানতে রাজি না হয়, তাহলে আমাকে বেসামরিক পোশাকে দেখতে প্রস্তুত থেকো। বঙ্গভবনে রওনা হওয়ার সময় আমার নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন আমার পিএস কর্নেল ফিরোজ হাসান সঙ্গে এস্কর্ট নিয়ে যেতে অনুরোধ করলে আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে, জন্ম-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। আমি তাকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে ১৪ ঘটিকায় (দুপুর ২টা) সেনাসদর থেকে বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা করলাম। আমার সঙ্গে গাড়িতে শুধু আমার এডিসি ক্যাপ্টেন মাহমুদ।’’

মামুন খালেদের গ্রেফতার ও ভূমিকা

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতারের একদিন পর বুধবার (২৫ মার্চ) রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব) মামুন খালেদকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি ছিলেন সংস্থাটির কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পরিচালক। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিনি ওই পদে ছিলেন। পরে তাকে সংস্থাটির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক ছিলেন।

তার বিষয়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও পরে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত আবু রুশদ এ আর এম শহিদুল ইসলাম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘‘ওয়ান-ইলেভেনের সময় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল, ওবায়দুল কাদের ও শেখ সেলিমদের জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে করা একটি প্রতিবেদনের কারণে তাকে গায়েব করে দিতে বলেছিলেন মামুন খালেদ। পরে তখনকার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মেজর জেনারেল অব আব্দুল মতিনের হস্তক্ষেপে বিষয়টির সুরাহা হয়।’’

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গোয়েন্দা হেফাজতে নির্যাতনেও মামুন খালেদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্রেফতারের পরদিন আদালতে রিমান্ড শুনানির সময় মামুন খালেদ আদালতকে বলেন, ‘‘আমি ২০০৭ সালে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) ফোর্সেস সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোতে যোগদান করি, যারা মূলত যোগাযোগব্যবস্থার দায়িত্ব পালন করে। সেখানে জুলাই পর্যন্ত কাজ করার পর আমি দায়িত্ব গ্রহণ করি। সে সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যতগুলো মামলায় জামিন হয়েছিল, সেই প্রত্যেকটি জামিনের ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বিচারকের কাছে টেলিফোন করতাম। আমাদের পক্ষ থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হতো।’’ তার এই বক্তব্যের মাধ্যমেই তার প্রভাব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তের অগ্রগতি

ওয়ান-ইলেভেনের সময় বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এই দুই সেনা কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার নাসিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘তাদের যেসব মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, সেসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তার প্রতিষ্ঠা‌নে মাধ‌্যমে মানবপাচা‌র করে কত টাকা আত্মসাৎ ক‌রে‌ছেন, তা বের করার চেষ্টা চল‌ছে। এছাড়া অন‌্য কারণগু‌লোর বিষ‌য়ে বলার ম‌তো অগ্রগ‌তি এখনও হয়‌নি।’’