মাগুরায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলনের ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ৪
মাগুরা শহরের জামরুলতলা এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের জেলা কার্যালয়ের সামনে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় জেলা আওয়ামী লীগের এক সহসভাপতিসহ ২১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করে আজ শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।
মামলার বিবরণ ও অভিযোগ
মাগুরা সদর থানায় দায়ের হওয়া এই মামলার বাদী হলেন পৌরসভার দরি মাগুরা এলাকার বাসিন্দা রেজোয়ান কবির, যিনি জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মামলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড ও অপপ্রচার চালানোর উদ্দেশ্যে জমায়েত, মিছিল এবং বোমা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মাগুরা শহরের জামরুলতলা এলাকার লতা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু সদস্য সমবেত হন। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা মিছিল করেন এবং বোমা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করেন।
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের পরিচয়
গতকাল বৃহস্পতিবার শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পুলিশ চারজনকে আটক করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন:
- জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক হীরক (৫২ বছর)
- জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোছা. সোনিয়া সুলতানা (৪০ বছর)
- পশু হাসপাতাল পাড়ার বাসিন্দা ও স্থানীয় একটি ব্যায়ামাগারের পরিচালক হাসান মাসুদ
- পারনান্দুয়ালী গ্রামের বাসিন্দা ওসমান আলী মোল্লা
মামলার এজাহারে এই চারজনের নামসহ অন্যান্য আসামিদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের প্রতিক্রিয়া ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য
পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার এনামুল হকের স্ত্রী লাতিফা পারভিন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি আজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব কিছুই তো সেখানে হয়নি। সেখানে যা হয়েছে সবই ভিডিওতে দেখা গেছে। সেখানে প্রথমে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়েছে, এরপর দেশ ও নেতা–কর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে এবং সবশেষে মোনাজাত করা হয়েছে। ওনাদের বক্তব্য ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়েছে এবং সবাই তা শুনেছে; তাই সেখানে কোনো গোপন বা নাশকতামূলক কিছু ছিল না।’
প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল বিকেলে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে এনামুল হক হীরকের নেতৃত্বে কয়েকজন নেতা–কর্মী পতাকা উত্তোলন করেন এবং মোনাজাত করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে এনামুল হককে বলতে শোনা যায় যে, ৫ আগস্টের পর দীর্ঘদিন দলীয় কার্যালয় বন্ধ ছিল। তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকার ক্ষমতায় আসার কথা উল্লেখ করে দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালুর আহ্বান জানান।
ঘটনার পরবর্তী অবস্থা
খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মীরা সেখানে গিয়ে পতাকা স্ট্যান্ড ভাঙচুর করেন। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, একপর্যায়ে ভবনের তৃতীয় তলায় থাকা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর চালানো হয় এবং ভাঙা আসবাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব আবদুর রহিম গতকাল বলেন, খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন যে সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করেছে। তবে কারা আগুন দিয়েছে, তা তিনি জানেন না বলে উল্লেখ করেন।
পূর্ববর্তী ঘটনা ও পুলিশের বক্তব্য
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিনও ওই কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। এরপর ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও কেউ ভাড়া নিতে আগ্রহ দেখায়নি, ফলে এটি ফাঁকা পড়ে আছে।
মাগুরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নাশকতার পরিকল্পনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া চার আসামিকে আজ আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।
