কিশোরগঞ্জে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে কর্মীদের তালা খোলার চেষ্টা, দেশজুড়ে সক্রিয়তা বাড়ছে
গুঁড়িয়ে দেওয়া কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে কর্মীরা বৃহস্পতিবার দুপুরে তালা খোলার চেষ্টা চালায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে এই দৃশ্য ধরা পড়ে। ২৬ ফেব্রুয়ারির এই ঘটনা দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের সক্রিয়তা বাড়ানোর একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দেশজুড়ে কার্যালয় খোলার তৎপরতা
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন থেকে গত দুই সপ্তাহে সারা দেশে আওয়ামী লীগের এক ডজনের বেশি কার্যালয়ের তালা খোলা হয়েছে। কোথাও কোথাও তালা না খুলে কার্যালয়ের সামনে স্লোগান দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি এর মাধ্যমে সরকারের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি কারাবন্দী নেতা-কর্মীদের জামিনপ্রাপ্তি ও মুক্তির ক্ষেত্রে সরকারের দিক থেকে প্রতিবন্ধকতা আসে কি না, সেটাও দেখতে চায় দলটি।
শেখ হাসিনার নির্দেশ ও স্থানীয় উদ্যোগ
দলটির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের আস্তে আস্তে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে জেলা ও মহানগর পর্যায়ে কিছু কিছু দলীয় কার্যালয় খোলার চেষ্টা চলছে। তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের নেতারা এসব উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের পরোক্ষ সহায়তা বা সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে।
বিশ্লেষকের মতামত
লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, "আওয়ামী লীগের একটি সমর্থক গোষ্ঠী আছে। তাঁদের অনেকেই ভোট দিয়েছেন। ফলে কিছুটা সহানুভূতি প্রত্যাশা করাটা অস্বাভাবিক নয়।" তিনি আরও যোগ করেন, আওয়ামী লীগকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে হলে দেশে কার্যকর নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে, কারণ তাদের পুরো নেতৃত্বই এখন বিদেশে।
জামিন ও মুক্তির আশা
আওয়ামী লীগের নেতাদের ধারণা, মধ্যম ও শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জামিন পেতে শুরু করলে সাংগঠনিক তৎপরতা কিছুটা বাড়বে। নেতাদের জামিন পাওয়ার বিষয়টি যাতে সহজ হয়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরাম এবং প্রভাবশালী দেশগুলোর সহায়তা পেতে দলটির পক্ষ থেকে চেষ্টা চলছে বলেও জানা গেছে। জামিন পাওয়ার বিষয়টি কিছুটা স্বাভাবিক হলে বিদেশে আত্মগোপনে থাকা নেতাদের কেউ কেউ দেশে ফেরার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।
সরকারের অবস্থান
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, "এটা আমরা চাইনি এবং যেহেতু আইনগতভাবে বলা আছে যে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেভাবেই এটাকে দেখা হবে সব জায়গায়।" তবে আওয়ামী লীগের নেতাদের কারও কারও মতে, নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশে অবস্থানরত নেতা-কর্মীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি তৈরি করেছে।
কার্যালয় খোলার প্রতীকী চেষ্টা
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরদিন পঞ্চগড়ের চাকলাহাটে স্থানীয় বিএনপির এক নেতার উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়া হয়। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে এক ডজনের বেশি কার্যালয় খোলা হয়েছে। কোথাও কার্যালয়ের ভেতরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙানো হয়, কোথাও তালা না খুলেই সামনে স্লোগান দেওয়া হয়।
ঐতিহাসিক পটভূমি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ নেতাদের অনেকে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১০ মে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। দলটির নিবন্ধন স্থগিত থাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কৌশল দুই ধারায় এগোচ্ছে—মাঠে সীমিত উপস্থিতি দেখানো এবং একই সঙ্গে সরকারের প্রতিক্রিয়া যাচাই করা। কার্যালয় খোলা ও জামিন প্রশ্নে সরকারের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে দলটির রাজনৈতিক পথচলা কতটা উন্মুক্ত বা সীমিত হবে।
