নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা তৎপরতা: স্থায়িত্বহীন কর্মসূচি ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা তৎপরতা ও মূল্যায়ন

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা তৎপরতা: স্থায়িত্বহীন কর্মসূচি ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয় লাভের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক জায়গায় নেতাকর্মীরা নিজেদের কার্যালয় খুলে দলীয় পতাকা উত্তোলন ও স্লোগান দিচ্ছেন, কিন্তু তাদের উপস্থিতি সেখানে স্থায়ী হচ্ছে না। এক ধরনের ঝটিকা কর্মসূচির পরই তারা কেটে পড়ছেন, যা কিছু ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত ফল বয়ে আনছে। কারণ, তাদের এমন কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতিপক্ষ সেই অফিস গুড়িয়ে দিচ্ছে বা নেতাকর্মীরা ধাওয়ার শিকার হচ্ছেন, এমনকি বেশ কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছেন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তৎপরতার পেছনের বার্তা

এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে— রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হঠাৎ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এমন তৎপরতা কীসের বার্তা বহন করছে? এ নিয়ে রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা দুই ধরনের মূল্যায়ন করছেন। কেউ কেউ বলছেন, সরকার হয়তো তাদেরকে সবুজ সংকেত দিয়ে থাকতে পারে, আবার কারও মতে, সরকার এখনই তাদেরকে উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ দেবে না। তবে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে হলে সরকারের কাছে দলটির আবেদন করা উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, ‘‘বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িক নিষিদ্ধ করেছে। সে হিসেবে তারা জোর করে কার্যালয় খোলা বা কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করলে সরকার চাইলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।’’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘তবে রাজনীতিতে ফিরতে হলে আওয়ামী লীগকে অবশ্যই নিজেদের অধিকার ফিরে পেতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাতে হবে। আমি মনে করি, যে প্রক্রিয়ায় দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তা সঠিক হয়নি।’’

ঝটিকা তৎপরতা বাড়লেও স্থায়িত্বের অভাব

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এক ধরনের জিরো টলারেন্সে থাকলেও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দিন থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। অনেক জায়গায় কার্যালয় খুলে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে, মিলাদ পরানো হয়েছে এবং ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিরোধ বা পুলিশের চোখ এড়াতে পরক্ষণেই নেতাকর্মীরা কেটে পড়েছেন। অনেক জায়গায় তারা ধাওয়ার শিকার হয়েছেন, আবার বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সবুজ সংকেত পেয়ে তারা সেখানে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। কারণ, নির্বাচনের আগে তাদের অনেকে বিএনপির পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করেছেন এমন খবরও বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে।

নির্বাচনের পরদিন রাজধানীর গুলিস্তানে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে কিছুক্ষণ অবস্থান নিয়ে দলীয় স্লোগান দেন কয়েকজন নেতাকর্মী, কিন্তু মুহূর্তেই সেখান থেকে সরে যান তারা। এরপর পঞ্চগড়, মাগুরা, ফরিদপুর, চাঁদপুর, ঠাকুরগাঁও, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী, যশোর ও খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় কার্যালয় খুলে স্লোগান দেন দলটির নেতাকর্মীরা। ময়মনসিংহের তারাকান্দায় কার্যালয় খোলার পর সেখানে বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ-ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।

ঘটনার ধারাবাহিকতা ও প্রতিক্রিয়া

গত ২০ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরে আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন যুবলীগ ও বর্তমানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এদিন সকাল ৭টায় শহরের চকবাজার মোড়সংলগ্ন থানা রোডে পৌর মার্কেট ভবনের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন তারা, এবং পরবর্তীকালে সেই কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। অপরদিকে নাটোরের নলডাঙ্গায় বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর উপজেলার ছাতারভাগ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

সর্বশেষ বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদের গাড়িবহরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে হামলার অভিযোগ উঠেছে। হাতিয়া উপজেলায় নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্প বাজার এলাকা পরিদর্শন করতে গেলে এ হামলার ঘটনা ঘটে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক কৌশল

এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন বলেন, ‘‘জুলাই আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ যেসব অপরাধ করেছে, অবশ্যই এর বিচার হতে হবে। তবে দলটির সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও এখনও পরিপূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়নি।’’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘‘আমরা মনে করি, নির্বাহী আদেশে কোনও দলকে নিষিদ্ধ করা যায় না। সে হিসেবে আওয়ামী লীগের তৎপরতাকে সরকার কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেটা তাদের ব্যাপার। তবে দলটির উচিত রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করা। অন্যথায়, এভাবে ঝটিকা কর্মসূচি দিয়ে রাজনীতির মাঠে টিকে থাকা কঠিন হবে।’’

কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

জুলাই আন্দোলনে গণহত্যায় জড়িত আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আন্দোলন শুরু হয়। এর সূচনা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবং পরবর্তীকালে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরাও এতে যুক্ত হন। এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগের সাময়িক কার্যক্রম স্থগিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এবং একই দিন দলটির নিবন্ধন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি দলটি, যদিও প্রকাশ্য কার্যক্রম না থাকলেও বিগত দিনে তারা বিভিন্ন সময় ঝটিকা মিছিল করেছে।

বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিক্রিয়া

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পরপরই আওয়ামী লীগের তৎপরতার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ বিষয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি বিবৃতিতে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগ একটি নিষিদ্ধ দল। তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার বৈধ এখতিয়ার নেই।’’

এর আগের দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি নয়াপল্টনে এক কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘‘সারা দেশের আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার বিষয়ে সরকারের সায় নেই। যেহেতু আইনগতভাবে তাদের কার্যক্রম সাময়িক নিষিদ্ধ, তাই আমরা এটি চাইনি। আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বিষয়টি দেখবে।’’ দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু যোগ করেন, ‘‘আওয়ামী লীগ কখন কীভাবে এসে অফিস খুলে স্লোগান দিয়ে চলে যাচ্ছে, সেটি বোধগম্য নয়। তবে যারা এর সঙ্গে সরকার বা বিএনপির যোগসাজশের অভিযোগ তুলছেন, তারা সঠিক বলছেন না।’’