অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী: বিএনপি নেতাদের বিস্ময় ও সমালোচনা
নতুন সরকার গঠনের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ড. খলিলুর রহমান, যিনি আগে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই নিয়োগে বিএনপি নেতারা সহ অনেকেই অবাক হয়েছেন, এমনকি দলটির অভ্যন্তরেও এ নিয়ে সমালোচনা ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ এই নিয়োগকে বিব্রতকর ও অস্বস্তিকর বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারে খলিলুর রহমানের ভূমিকা ও সমালোচনা
অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসে খলিলুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে বারবার আলোচনা-বিতর্ক হয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন ইস্যুতে তার সমালোচনা করেছেন, এমনকি তাকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিও জানিয়েছিলেন। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবিক করিডর, এবং চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনা নিয়ে তার ভূমিকা সমালোচনার মুখে পড়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে বিএনপির সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন তার পদত্যাগ দাবি করেছিলেন।
নতুন সরকারে নিয়োগ: কেন এই সিদ্ধান্ত?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ নেতার এখতিয়ারে মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়, এবং সম্ভাব্য নামগুলো গোপন রাখা হয়। তবে খলিলুর রহমানের মন্ত্রী হওয়ার খবর শেষ মুহূর্তে আলোচনায় এসেছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, তারা এই নিয়োগের ব্যাপারে অন্ধকারে ছিলেন এবং সংবাদমাধ্যমে খবর দেখে অবাক হয়েছেন।
তবে কিছু নেতা যুক্তি দিচ্ছেন যে, কূটনীতিতে খলিলুর রহমানের পেশাদারিত্ব আছে, এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষায় একজন দক্ষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়োজন। এছাড়া, তারেক রহমানের সঙ্গে তার পুরনো সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ও বিবেচনায় থাকতে পারে।
নাগরিকত্ব ও সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন
খলিলুর রহমানের নাগরিকত্ব নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। বিএনপি নেতারা অভিযোগ তুলেছিলেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, যা তিনি অস্বীকার করে আসছেন। তার দাবি, তিনি শুধু বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, দুই যুগের বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের কারণে এই প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া, অন্তর্বর্তী সরকার বিদায়ের আগে প্রকাশিত সম্পদের হিসাবে দেখা গেছে, তার বেশিরভাগ সম্পদ বিদেশে রয়েছে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়া
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রথম দিনেই নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন। যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বিজয়ী দলের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে কিনা, তিনি বলেন, ‘আমি তো জোর করে যাইনি। একেকজনের একেকজন সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা থাকতে পারে, সেটা পরিবর্তনও হয়।’ নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘গুণে নেন আরেকবার। গুনতে তো মুশকিল নাই।’
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি নেতারা দীর্ঘদিন ধরে খলিলুর রহমান সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করলেও, এখন তাকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি অনেকের জন্য বিস্ময়কর, কারণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিশ্ব বাংলাদেশকে দেখবে। সাবেক কূটনীতিকদের মতে, ২০২৫ সালের জুন মাসে লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের সময় খলিলুর রহমান বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করেছিলেন, যা এই নিয়োগের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সর্বোপরি, এই নিয়োগ রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব কূটনৈতিক সম্পর্ক ও দেশের ভাবমূর্তিতে কীভাবে পড়বে, তা সময়ই বলবে।
