নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ: বিএনপির নেতৃত্বে সরকারের যাত্রা শুরু
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হলো গতকাল মঙ্গলবার, যখন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পুরোনো রাজনৈতিক ধারা থেকে দেশকে মুক্ত করার পথ তৈরি করেছে, এবং এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের প্রতি নাগরিকদের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
শপথ অনুষ্ঠানের বিবরণ
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিকেলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীকে শপথ পড়ান। এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, কারণ রেওয়াজ ভেঙে এবার মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথের আনুষ্ঠানিকতা বঙ্গভবনের দরবার হলের পরিবর্তে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই পরিবর্তনটি নতুন সরকারের স্বচ্ছতা ও জনগণের কাছাকাছি থাকার প্রতীক হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
এর আগে, মঙ্গলবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি বিএনপির সংসদ সদস্যরা, যা শুরু থেকেই একটি মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দেয়। পরবর্তীতে, দুপুরে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা শপথ পাঠ করেন, যেখানে জামায়াত ও এনসিপির নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ ও নতুন চ্যালেঞ্জ
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথের মধ্য দিয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের দায়িত্ব শেষ হলো। ১২ ফেব্রুয়ারি একটি পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পর স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারকে ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে ঠিক পথে আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সাধন, এবং দুর্দশাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বিএনপি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছে, যা জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নানা প্রতিশ্রুতির অংশ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নির্ভর করবে নতুন মন্ত্রিসভা কতটা যোগ্যতা, দক্ষতা, এবং সততার সঙ্গে কাজ করতে পারছে, তার ওপর।
মন্ত্রিসভার গঠন ও সমালোচনা
দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করা বিএনপির এবারের মন্ত্রিসভায় প্রবীণ ও নবীনদের সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। তবে, মন্ত্রিসভার আকার যে প্রত্যাশার চেয়ে বড় হয়েছে, সেটা বলাই বাহুল্য। নতুন মন্ত্রিসভার অনেকে বিএনপির আগের সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করেছেন, এবং তাঁরা সবাই সফল ছিলেন এমন বলা যাবে না। বরং, কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে তখন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। নতুনদের কয়েকজনকে নিয়েও জনমনে প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়েছে। আমরা আশা করি, শুরু থেকেই মন্ত্রিসভার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নীতি প্রতিষ্ঠা করা হবে।
শপথ নেওয়ার পর বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে সংসদ সদস্যরা সরকারি সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা একটি অভিনন্দনযোগ্য পদক্ষেপ। নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম ১০০ দিনের নেওয়া পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্তগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরকার কোন পথে যেতে চায়, তার একটি সংকেত এর মধ্য দিয়েই পাওয়া যাবে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশা
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে শুরুতেই যে মতপার্থক্য দেখা গেল, সেটা অপ্রত্যাশিত ও দুঃখজনক। এটা যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিভাজন তৈরি না করতে পারে, সেদিকে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোকে সর্বোচ্চ সচেতন ও দায়িত্বশীল থাকা প্রয়োজন। আমরা মনে করি, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির দায়িত্ব এ ক্ষেত্রে বেশি। জাতীয় সংসদেই আলাপ-আলোচনা, তর্কবিতর্কের মধ্য দিয়ে এই মতপার্থক্যের সমাধান হতে হবে।
গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ এবং জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতি সরকারি দল, বিরোধী দলসহ সব পক্ষই শ্রদ্ধাশীল থাকবে বলে আমরা আশা করি। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গণতান্ত্রিক উত্তরণের যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, তা কোনোভাবেই ব্যাহত করার সুযোগ নেই। জাতীয় সংসদকেই রাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এবং নতুন সংসদ ও সরকারের যাত্রাপথ মসৃণ হবে, সেটাই নাগরিকেরা প্রত্যাশা করেন।
