সংবিধান সংস্কার পরপদে শপথ নিল না বিএনপি, জামায়াত-এনসিপি নিল উভয় পদে
বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নিল না, জটিলতা

সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নিল না বিএনপি, জামায়াত-এনসিপি নিল উভয় পদে

জাতীয় সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ করলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। অন্যদিকে, জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য—উভয় পদেই শপথ নিয়েছেন। বিএনপি ও ১১ দলীয় জোটের এই পক্ষে-বিপক্ষের অবস্থানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন জটিলতা ও বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে।

বিতর্কের সূচনা ও প্রতিক্রিয়া

বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে প্রথমে এ বিতর্কের সূত্রপাত হয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের মন্তব্য ঘিরে। সংসদ ভবনে শপথ নেওয়ার আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবে। কারণ, তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হননি। তাই তারা শপথ নেবেন না।’’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংবিধানে এ বিষয়টি এখনও ধারণ করা হয়নি বলে তারা শপথ নিচ্ছেন না।

এরপর থেকেই প্রধান বিরোধী দল জামায়াত ও তাদের মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তাদের অভিযোগ, বিএনপি জুলাই সনদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে শহীদদের রক্তের সঙ্গে গাদ্দারি করেছে। জামায়াত ও এনসিপি প্রথমে ঘোষণা দেয়, বিএনপি নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে তারাও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবে না। এনসিপির শীর্ষ নেতারা ফেসবুকে বিএনপির বিরুদ্ধে তীর্যক মন্তব্য করতে থাকেন।

শপথ গ্রহণ ও বয়কটের ঘোষণা

তবে দুপুরে নিজেদের বৈঠকের পরক্ষণেই তারা শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। অবশ্য সিইসির কাছে তারা একইসঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথগ্রহণ করেন। বিলম্বে আসায় জামায়াত ও এনসিপির সদস্যদের সঙ্গেই শপথ নেন বিএনপির ইশরাক হোসেন ও স্বতন্ত্র সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ শুরু হলে ইশরাক ও রুমিন বের হয়ে যান। এ নিয়েও নানা আলোচনা হচ্ছে।

জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জনরায়ের সাথে প্রতারণামূলক অবস্থান নেওয়ায় প্রতিবাদস্বরূপ গঠিত হতে যাওয়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১১দলীয় জোট। আকাঙ্ক্ষা ও জনরায়ের প্রতি সম্মান জানাতে সংবিধান সংস্কার পরিষদসহ সংসদ সদস্য হিসেবে পর পর দুইটি শপথ নিচ্ছেন এনসিপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। সে অনুযায়ী তারা দুইটি শপথ নিয়েছেন। তবে প্রতিবাদ স্বরূপ মন্ত্রিসভার শপথে যোগ দেননি।

জুলাই সনদ ও আইনি দৃষ্টিভঙ্গি

জুলাই সনদ আদেশের ৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে, ‘নির্বাচিত প্রতিনিধি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পর একই শপথ অনুষ্ঠানে এই আদেশের তফসিল-১ অনুযায়ী পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন এবং অনুরূপ শপথপত্রে স্বাক্ষর করবেন।’ তবে বিএনপির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

এ বিষয়ে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘‘বিএনপি প্রথম দিনেই জুলাই সনদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে একটি দুর্ভাগ্যজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো। এটি হতাশাজনক। কারণ তারা যে অজুহাতের কথা বলছে, তা যুক্তিযুক্ত নয়। রাষ্ট্রপতির আদেশেই তো গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। এখন যদি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তারা শপথ নিয়ে থাকে, তাহলে সেই আদেশে হওয়া গণভোটের ম্যান্ডেটও তাদের মেনে নেওয়া উচিত। না হলে জুলাই সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হবে।’’ তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, এ নিয়ে নতুন করে রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে ওঠার শঙ্কা রয়েছে।

রাজনীতিবিদদের মতামত

গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া না নেওয়া নিয়ে দুই ধরনের মত দিয়েছেন রাজনীতিবিদরা। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব জয়নাল আবেদী শিশির বলেন, ‘‘বিএনপি গণভোটের রায়কে অস্বীকার করে চব্বিশের শহীদদের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। এটা এক এক ধরনের প্রতারণা। কারণ সাংবিধানিক আদেশে যেমন গণভোট হয়েছে, তেমনই জাতীয় নির্বাচনও হয়েছে। তাই জাতীয় নির্বাচন মানলে গণভোটের আদেশও মানতে হবে। অন্যথায়, আমরা কঠোর কর্মসূচিতে যেতে পারি।’’

অন্যদিকে, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, ‘‘বিএনপি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সঠিক হয়েছে। কারণ এটি সংবিধানে নেই। সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের ২(ক) ধারায় স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার শপথ পাঠ করাতে অপারগ হলে বা অনুপস্থিত থাকলে, তিন দিনের মধ্যে তাদের মনোনীত প্রতিনিধি শপথ পড়াবেন। সেটিও না হলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে শপথ পাঠ করাবেন। সেই বিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনারই শপথ পড়িয়েছেন। সেটি ঠিক আছে।’’ তিনি আরও যোগ করেন, জামায়াত ও এনসিপি এই নিয়ে অহেতুক জল ঘোলা করার চেষ্টা করছে।

বিএনপির যুক্তি হলো, তারা নির্বাচনের ইশতেহারেই বলেছে—এ ধরনের শপথ তারা নেবে না। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের বিধান সংবিধানে না থাকায় তারা শপথ নিচ্ছেন না। তবে এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিভক্তি ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।