জামায়াত নেতার হুঁশিয়ারি: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে ক্ষমতাসীনদের ফ্যাসিবাদী পরিণতি হতে পারে
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে ফ্যাসিবাদী পরিণতির হুঁশিয়ারি

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে হুঁশিয়ারি: জামায়াত নেতার বক্তব্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সতর্ক করে দিয়েছেন যে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রকাঠামো গঠন না হলে যাঁরা ক্ষমতাসীন হতে যাচ্ছেন, তাঁদের ফ্যাসিবাদের পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে। আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে ১১-দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

নির্বাচনী অনিয়ম ও সহিংসতার প্রতিবাদ

সমাবেশটি আয়োজিত হয় সারা দেশে নির্বাচন-পরবর্তী বিএনপি কর্তৃক সহিংসতা চালানোর অভিযোগের প্রতিবাদে। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, হঠাৎ করে নির্বাচনের ফল সম্প্রচার বন্ধ করে রহস্যের জাল তৈরি করে ১১-দলীয় ঐক্যের বিজয়ের বার্তাকে একের পর এক থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই রহস্য জাতির কাছে অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের পক্ষ থেকে যেসব আসনে অনিয়মের অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, সেগুলোর সুবিচারের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানান তিনি। জামায়াতের এই নেতা আরও অভিযোগ করেন, 'ম্যানুপুলেশন করে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও তারা জাতির ওপর হামলে পড়েছে। খুন, সন্ত্রাস, হামলা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। মা-বোনদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। এই দৃশ্য ফ্যাসিবাদের চিত্র মনে করিয়ে দিচ্ছে।'

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জোর দাবি

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি অভ্যন্তরীণভাবে গণভোটে 'না' ভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছে এবং অনেক কেন্দ্রে ধানের শীষের ভোট আর 'না' ভোট সমান হয়েছে। নির্বাচনের পরে টক শোতে অনেকে জুলাই সনদের যা কিছু ঐকমত্য হয়েছে, তা সরকার মানতে বাধ্য নয়—এমন আলাপ তুলছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে আরেকটি জুলাই তৈরি হবে।

নতুন সরকারের কাছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের হত্যার বিচার এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার বিচারের দাবি জানান তিনি।

অন্যান্য নেতাদের বক্তব্য

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মানুষের ব্যালটের অধিকারের সঙ্গে নির্মম তামাশা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সারা দিন শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রকাশ্য নাটক সাজিয়ে সন্ধ্যার পর থেকে সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের সংসদে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

মামুনুল হক প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'আপনার পূর্ববর্তী সিইসির পরিণাম থেকে আপনি শিক্ষা গ্রহণ করুন। আমরা যে আপত্তি জানিয়েছি, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে জনগণের ব্যালটের অধিকার যদি ফিরিয়ে না দেন, বাংলার মানুষ জোর করে তাদের অধিকার কেড়ে নেবে।'

তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পুরোনো ফ্যাসিবাদীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যদি কেউ তাদের প্রবেশ করবার সুযোগ তৈরি করে দিতে চায়, তাহলে সেই পথ দিয়ে তাদেরও দিল্লিতে বিতাড়িত করা হবে।

ভোট ডাকাতির অভিযোগ

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সমাবেশে বলেন, এবারের নির্বাচনে ভোট চুরি নয়, ভোট ডাকাতি হয়েছে। ভোটে অনিয়মের প্রতিবাদের পাশাপাশি নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, হামলার সব ঘটনার হিসাব নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে সংসদে যাওয়ার কথা বলেছেন।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন:

  • এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান
  • লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য ওমর ফারুক
  • বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান)
  • খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আব্দুল জলিল
  • জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান
  • বিডিপির মহাসচিব নিজামুল হক নাঈম
  • ঢাকা-১২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন

আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল, সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রমুখ।

বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের সমাপ্তি

সমাবেশ শেষে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি পুরানা পল্টন, জাতীয় প্রেসক্লাব, মৎস্য ভবন হয়ে শাহবাগ গিয়ে শেষ হয়। এ সময় তাঁরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। এই সমাবেশ ও মিছিলের মাধ্যমে ১১-দলীয় ঐক্য নির্বাচনী অনিয়ম, সহিংসতা বন্ধ এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরে।