জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের কিশোরগঞ্জ সফরে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান রোববার কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলায় এক স্মরণসভায় অংশ নিয়ে সংস্কারের ওপর গণভোটের পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'সংস্কারের ওপর যে গণভোট হয়েছে, এটার পুরোটাই মানতে হবে। এর কোনো খণ্ডিত অংশ আমরা বাস্তবায়ন দেখতে চাই না।' এই মন্তব্য তিনি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের বালিখলা ফেরিঘাটে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে করেন।
সংসদীয় ব্যবস্থা ও বিরোধী দলের ভূমিকা
শফিকুর রহমান সংসদীয় গণতন্ত্রের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, 'দেশটা তো সংসদ থেকেই পরিচালিত হবে ইনশা আল্লাহ। সংসদে একটা দল সরকারি দল হিসেবে, আরেকটা দল বিরোধী দল হিসেবে থাকবে। সমাজে এক চাকায় কোনো গাড়ি চলে না, মিনিমাম দুই চাকা লাগে।' তিনি আরও যোগ করেন, সরকারি দল ইতিবাচক কার্যক্রম পরিচালনা করলে জামায়াতের সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু জনস্বার্থ বিঘ্নিত হলে তারা জনগণের পক্ষে অবস্থান নেবে।
বিএনপি চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টি প্রসঙ্গ
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সম্ভাব্য সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, 'তারেক সাহেব কী নিয়ে আলাপ করবেন, এটা উনার মনের ব্যাপার। আমি তো উনার মনের ব্যাপার বলতে পারব না। উনি যদি আমার সঙ্গে আলাপ করেন, দেশ এবং জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ইনশা আল্লাহ আমরা আলাপ করব।' অন্যদিকে, জাতীয় পার্টি সম্পর্কে তিনি কঠোর ভাষায় মন্তব্য করেন, 'জাতীয় পার্টি তো এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। এরা তো এখন ভূগোলে নাই। কেন নাই? তারা (জাতীয় পার্টি) তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল।' তিনি দাবি করেন, জাতীয় পার্টি জনগণের মন থেকে উঠে গেছে কারণ তারা জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেনি, এবং জামায়াত এই ভুল করবে না।
কৃষক-শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
স্মরণসভায় শফিকুর রহমান সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে কৃষক ও শ্রমিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'সাধারণ মানুষকে সম্মান করা আমার ইমানি দায়িত্ব। কৃষক-শ্রমিকেরা কঠোর পরিশ্রম করে হালাল রুজি উপার্জন করেন। তাঁদের ঘামের গন্ধ আমার কাছে আতরের মতো মনে হয়।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে তিনি নিজে একজন কৃষক পরিবারের সন্তান, তাই কৃষক-শ্রমিকদের সম্মান না করলে তা তার বাবাকে অপমান করার শামিল হবে।
তিনি দুই শ্রেণির মানুষের সান্নিধ্যে বিশেষ আনন্দ পাওয়ার কথা বলেছেন:
- নিষ্পাপ শিশু, যাদের কাছে গেলে ফেরেশতার সান্নিধ্যের অনুভূতি হয়।
- দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ, যারা রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের মুখে হালাল খাবার তুলে দেন।
স্মরণসভা ও পরিবার পরিদর্শন
এই সফরে শফিকুর রহমান ইটনা উপজেলার শিমুলবাক দক্ষিণহাটি এলাকায় জামায়াত সমর্থক শাহ আলমের স্মরণসভায় বক্তব্য রাখেন। শাহ আলম ৮ ফেব্রুয়ারি ইটনা মিনি স্টেডিয়ামে নির্বাচনী সমাবেশে যাওয়ার পথে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। জামায়াতের আমির শাহ আলমের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন।
এরপর তিনি নিকলী উপজেলার ছাতিরচরে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জামায়াত কর্মী আব্দুস ছালামের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আব্দুস ছালাম ৩ ফেব্রুয়ারি কটিয়াদী সরকারি কলেজ মাঠের নির্বাচনী জনসভা শেষে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন।
সফরসঙ্গী ও উপস্থিতি
শফিকুর রহমানের কিশোরগঞ্জ সফরে তাঁর সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি সামিউল হক ফারুকী, জেলা জামায়াতের আমির মো. রমজান আলী, জেলা জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমির মোসাদ্দেক ভূঞা, কাপাসিয়ার নবনির্বাচিত এমপি সালাউদ্দিন আইয়ুবী, ঢাকা উত্তর মহানগর জামায়াতের মজলিশে শুরা সদস্য রোকন রেজা শেখ প্রমুখ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
জামায়াতের আমিরের এই সফরটি কিশোরগঞ্জের স্থানীয় রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে উল্লেখযোগ্য আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে তাঁর সংস্কার গণভোট ও বিরোধী দলের ভূমিকা সংক্রান্ত মন্তব্যগুলো ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।
