জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের অজানা অধ্যায়
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমির ড. শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক যাত্রার শুরুটা ছিল এক গোপন ও বিস্ময়কর অধ্যায়ে। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ কলেজে পড়ার সময়ে তিনি এক ধরনের হতাশা অনুভব করেছিলেন, যা তাকে জাসদ ছাত্রলীগ ছাড়তে বাধ্য করে। কলেজ হোস্টেলেই তখন গোপনে কার্যক্রম চালানো এক ইসলামী সংগঠনের সাক্ষাৎ পান তিনি, যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় সম্পূর্ণভাবে।
ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির মূলধারায়
ড. শফিকুর রহমানের প্রাথমিক রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। জামায়াতে ইসলামীর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুযায়ী, তিনি ১৯৭৩ সালে জাসদ ছাত্রলীগের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন এবং ১৯৭৬ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদান করেন। তবে সেই সময়ের জাসদ ছাত্রলীগের সক্রিয় নেতারা দাবি করেন, শফিকুর রহমানের সক্রিয় সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই।
জানা যায়, ১৯৮৩ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভের পর তিনি পুরোপুরি রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন এবং ১৯৮৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। সিলেট শহর, জেলা ও মহানগর আমীরের দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি দলটির সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নেতৃত্ব শূন্যতা ও উত্থানের মুহূর্ত
জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ড. শফিকুর রহমানের উত্থান ঘটে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতার ফাঁসি হওয়ার পর তৈরি হওয়া নেতৃত্ব শূন্যতার মধ্যেই তিনি প্রথমে দলের সেক্রেটারি জেনারেল ও পরে আমির নির্বাচিত হন। ২০১০ সালে জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ গ্রেফতার হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল হয়েছিলেন এটিএম আজহারুল ইসলাম।
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে এটিএম আজহারুল ইসলাম নিজেও যুদ্ধাপরাধের মামলায় আটক হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পান তখনকার সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালের নভেম্বরে তিনি জামায়াতের রুকনদের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রথমবারের মতো দুই বছর মেয়াদের জন্য দলটির আমির নির্বাচিত হন।
জামায়াতের রূপান্তরে শফিকুর রহমানের ভূমিকা
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ড. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বেই জামায়াতে ইসলামী একটি উল্লেখযোগ্য রূপান্তর ঘটেছে। দলটি নিজস্ব সাংগঠনিক খোলস ভেঙে বেরিয়ে এসে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই দলটি সংখ্যালঘু ও মুক্তিযোদ্ধাদের দলে ভিড়িয়ে সংসদ নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দিয়েছে, যা জামায়াতের ইতিহাসে একটি নতুন দিক নির্দেশনা।
দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেছেন, "তিনি দলটিকে নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলে আটকে না রেখে সবমহলের কাছে নিয়ে এসেছেন। জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসেই এটি একটি ভিন্ন ডাইমেনশন।"
ব্যক্তিগত জীবন ও প্রাথমিক শিক্ষা
জামায়াতে ইসলামী ও ড. শফিকুর রহমানের নিজের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, তার জন্ম ১৯৫৮ সালের ৩১ অক্টোবর মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়। তার তিন ভাই ও এক বোন রয়েছে এবং তিনি ভাই-বোনদের মধ্যে তৃতীয়। তিনি ১৯৭৪ সালে এসএসসি পাশ করেন এবং ১৯৭৬ সালে এইচএসসি পাশের পর সিলেট মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন, যা পরবর্তীতে ওসমানী মেডিকেল কলেজ নামে পরিচিত হয়।
সেই সময়ের জাসদ ছাত্রলীগের নেতা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, "শফিকুর রহমান মেডিকেলের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার দুই বছরের জুনিয়র ছিল। স্বাধীনতার পরের ওই সময়ে জাসদ ছাত্রলীগের তখন জোয়ার ছিল। আমি সিলেটের তখনকার জাসদ ছাত্রলীগের নেতাদের কাছে থেকে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো তথ্য পাইনি।"
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি আলোচনা প্রচলিত আছে যে, জামায়াতের বর্তমান নেতাদের মধ্যে কয়েকজনই স্বাধীনতা পরবর্তী কালে, যখন জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ ছিল, তখন ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ কিংবা ছাত্র ইউনিয়নের মতো বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। পরে জিয়াউর রহমান সরকারের সময়ে, জামায়াত যখন রাজনীতির অনুমতি পায়, তখন তারা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সময়ে জামায়াতে ইসলামীতে সক্রিয় হন।
ডা. মুশতাক হোসেন আরও উল্লেখ করেন যে, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে জামায়াত থেকে এমপি হওয়া লতিফুর রহমান জাসদ ছাত্রলীগে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে তার জানা আছে।
২০২৩ সালে ও ২০২৫ সালে আবারও আমির নির্বাচিত হয়ে ড. শফিকুর রহমান বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন। তার নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করার চেষ্টা করছে, যা দলের ঐতিহ্যবাহী অবস্থান থেকে কিছুটা ভিন্ন পথের নির্দেশক বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
