প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসে অফিসার ও সৈনিকদের এক প্রীতিভোজ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। তিনি সবার সহযোগিতা পেলে সরকার ‘কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
তারেক রহমান বলেন, ‘সৈনিকসহ দেশের সাধারণ মানুষ দেশকে যেভাবে কল্পনা করে, সরকার চেষ্টা করছে পর্যায়ক্রমে দেশটাকে সেভাবেই গড়ে তুলতে। আমি বহু বছর দেশে থাকতে পারিনি। কেন পারিনি সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। কারণ, সে সময় দেশে ভালো-মন্দ কী হয়েছে, তা নিয়ে সবারই কমবেশি ধারণা আছে। কিন্তু এখন আমরা দেশকে ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে চাই।’
দেশ গঠনে সবার দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সবারই নির্দিষ্ট কর্তব্য আছে। আমরা যদি যার যার অবস্থান থেকে সঠিকভাবে সেগুলো পালন করি, তবে অবশ্যই আমাদের কাঙ্ক্ষিত দেশটি গড়ে তুলতে সক্ষম হব।’
ঈদুল আজহার অনুষ্ঠান
ঈদুল আজহার দিন বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসে অফিসার ও সৈনিকদের এক প্রীতিভোজ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তারেক রহমান বলেন, ‘আজ ঈদের দিনে আসুন, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি এবং তাঁর রহমত কামনা করি, তিনি যাতে আমাদের সবাইকে আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের তৌফিক দান করেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘একই সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালনের মধ্যে দিয়ে আমরা যাতে সারা দেশের মানুষকে নিরাপদ রাখতে পারি এবং প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি—আল্লাহর কাছে এটাই চাওয়া।’
অনুষ্ঠানের আয়োজন
ঈদুল আজহা উপলক্ষে দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসের জিয়া কলোনিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘মৃত্যুঞ্জয়ী পঁচিশ’ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এই প্রীতিভোজের আয়োজন করে। এতে অফিসার ও সৈনিকেরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানস্থলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন তাঁর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর অফিসার, সৈনিক এবং তাঁদের সন্তানদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে তারেক রহমান পঁচিশ মৃত্যুঞ্জয়ী ভবনের সামনে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন।
শৈশবের স্মৃতিচারণ
প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতে ঢাকা সেনানিবাসে তাঁর শৈশবকালের স্মৃতি রোমন্থন করেন। তিনি বলেন, ‘আমি যখন আসছিলাম, সে সময় হঠাৎ মনে হলো আমি ৪৫/৪৬ বছর পেছনে চলে গেছি। আমার সঙ্গে যাঁরা গাড়িতে ছিলেন, তাঁদেরকেও এই গল্পটা বলছি। ১৯৭৫/৭৬ বা ৭৭ সালের কথা হবে। সিএমএইচের গেটটা তখন এত বড় ছিল না। গাড়িতে সঙ্গে থাকা এডিসিকে জিজ্ঞেস করলাম, সিএমএইচে ঢোকার পরে ছোট একটা প্যাথোলজি ছিল; ওটার সামনে বাগানের মতো একটা জায়গা ছিল; সেখানে দু–তিনটা সিমেন্টের বেঞ্চ ছিল; সেগুলো এখনো আছে?’
‘তারপর আবার বললাম, একদম সোজা গেলে হাতের বাঁ দিকে ছিল ফ্যামিলি ওয়ার্ড আর ডান দিকে তখন স্টাফ সার্জন বসতেন। আর টিনের ঘরে স্টাফ সার্জন বসতেন। আমার জ্বর হলে একা একাই চলে যেতাম। এখনো মনে আছে, ওই সময়ে স্টাফ সার্জন ছিলেন মেজর আনোয়ার।’
প্রধানমন্ত্রীর স্মৃতিচারণে আরও উঠে আসে প্রতিদিন বিকেলে শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে সাইকেল চালিয়ে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার কথা। তারেক রহমান বলেন, ‘ওই সময় প্রায় প্রতিদিন বিকেল বেলা বন্ধুদের সঙ্গে বের হতাম ৭-৮টা সাইকেল নিয়ে। সাইকেল চালাতে চালাতে সিগন্যালের কাছে মসজিদটার ওখানে যেতাম। সেই মসজিদটা এখন আরও অনেক সুন্দর! তখন পুরোপুরি সাদা চুনের পেইন্ট করা ছিল।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘মূল বিষয়টা হচ্ছে যে এই এলাকাটা বহু পুরোনো। আমরা যেখানে বসে আছি, একসময় এখানে জঙ্গলের মতো ছিল। আপনারা এখন অনেক সুন্দর একটা জায়গা দেখছেন, কিন্তু তখন রাস্তাটা সরু ছিল। আমি আজ এমন একটা স্থানে এসেছি, যেখানে আমার জীবনের বিরাট একটা বড় অংশ জড়িয়ে আছে। আমার ভালো-মন্দ, কষ্ট-ব্যথা, সুখ-দুঃখের বিশাল স্মৃতি এই পুরো এলাকায় মিশে একাকার আছে।’
সেনাসদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে ঈদ, আনন্দের দিন। আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করলাম কারণ এই জায়গাটায় এলে একটা আলাদা অনুভূতি কাজ করে। কারণ, ছোটবেলা থেকে এখানে বড় হয়েছি। সৈনিকদের ব্যারাকের ভেতরে ঘুরে বেড়াতাম, তাদের সঙ্গে কথা বলতাম।’
অফিসার ও সৈনিকদের দেশমাতৃকার প্রতি দায়িত্ববোধের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা দেশের প্রয়োজনে অনেকেই হয়তো আজ ছুটিতে যেতে পারেননি। স্বাভাবিকভাবে ঈদের সময় মানুষ পরিবারের সঙ্গেই থাকতে চায়। আপনাদের স্যাক্রিফাইসের জন্য আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই।’ তারেক রহমান আরও বলেন, ‘দেশ এবং জাতি আপনাদের এই আত্মত্যাগকে অবশ্যই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।’
সাফল্যের মাইলফলক
সেনাসদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের দায়িত্ব পালন ও কল্যাণের যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে সরকার অবগত রয়েছে। সাম্প্রতিক একটা ভিডিওকে আপনাদের সাফল্যের মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কয়েক মাস আগে একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছিল; দুটি পত্রিকা অফিসে আগুন ধরানো হয়েছিল। আপনারা সেখান থেকে প্রায় ১৮ জন সাংবাদিককে উদ্ধার করেছিলেন। এটি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।’
তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের এবং দেশের মানুষের প্রয়োজনে সৈনিকেরা জীবন দেয়। আর আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, সেই জীবন এবং সেই আত্মত্যাগের মূল্যায়ন করা। আর সেটির প্রথম শর্ত হচ্ছে নিজের দেশ সম্পর্কে সবার আগে চিন্তা করা। কারণ, আমরা সবাই এই দেশটাকে ভালো অবস্থানে দেখতে চাই।’
সমাজের সকল স্তরের মানুষের চাওয়া
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সমাজের সকল স্তরের মানুষ চায়, তাদের সন্তানেরা যেন সুন্দরভাবে লেখাপড়া করার সুযোগ পায় এবং পরিবারের সদস্যরা যাতে সুচিকিৎসার সুযোগ পায়। সাধারণত মানুষ যাতে নিরাপদে বসবাস করতে পারে, আমরা সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি।’



