ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, কাজী নজরুল ইসলাম মানেই বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ভোরের উদয়। শনিবার (২৩ মে) বিকালে ত্রিশালে তিন দিনব্যাপী জন্মজয়ন্তী উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
নজরুলের অবদান প্রসঙ্গে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের জাতীয় ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম একটি অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত ও পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো। আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-সংগ্রাম, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্য তার রচনায় মহিমাময় সৌন্দর্যে বাক্সময় হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিপ্লব-বিদ্রোহ, রণসংগীত, ইসলামী মূল্যবোধের গান, ভজন, কীর্তন, শ্যামাসংগীত, প্রেম-প্রকৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল সত্য প্রকাশ করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের এক নতুন রুচির বিপ্লব। তিনি ছিলেন নারী অধিকার, মেহনতি মানুষের কল্যাণ ও অসাম্প্রদায়িক বিশ্ব মানবতার অনন্য ফেরিওয়ালা। এই মহাকবি বাংলাদেশের আবহমানকালের চির যৌবনের প্রতীক।
আইনের শাসন ও মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, একটি নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্র এবং সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন। একইসঙ্গে জাতীয় জীবনে বাংলাদেশের আবহমানকালের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পুনর্জীবন ঘটাতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসন দেশের মানুষের অধিকার ও অর্থসম্পদ লুট করেছে এবং বিচার বিভাগসহ সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। বিশেষ করে বিতাড়িত ফ্যাসিবাদের সময়ে মানবতা, মানবিকতা ও দেশের ধর্মীয়-সামাজিক মূল্যবোধ বিনষ্ট করা হয়েছে।
জন্মবার্ষিকী আয়োজন ও স্মরণ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী দুই দিন পর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানান তিনি। ২০০৬ সালের পর ত্রিশালে জাতীয় পর্যায়ে নজরুল জন্মজয়ন্তী উদযাপিত হয়নি। প্রায় দুই দশক পর পুনরায় রাষ্ট্রীয়ভাবে এই আয়োজন করতে পেরে সরকার গৌরব বোধ করছে। তিনি মরহুম দারোগা রফিজ উল্লাহকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন, যিনি ত্রিশালের কাজীর সিমলা গ্রামে নিজ বাড়িতে কবিকে নিয়ে আসেন।
জিয়াউর রহমানের ভূমিকা
তারেক রহমান বলেন, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ না করলে জাতি হিসেবে দৈন্যতা প্রকাশ পায়। এ প্রজন্মের অনেকেই জানেন না, ১৯৭৬ সালে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় কবির জানাজার পর যারা কবির লাশবাহী খাটিয়া কাঁধে বহন করেছিলেন, তাদের অন্যতম ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালের ২৫ মে জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকার ফার্মগেট থেকে কবির মাজার পর্যন্ত অনুষ্ঠিত একটি র্যালিতেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও স্মারক প্রদান
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ত্রিশালে জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। কাউকে সম্মান জানালে নিজের সম্মান নষ্ট হয় না, বরং বিনয় মানুষকে মহিমান্বিত করে। তিনি সতর্ক করেন, এসব কালজয়ী আদর্শ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় দৃশ্যমান। অনুষ্ঠানে নজরুল সঙ্গীতে মঈনুল ইসলাম ও সাহিত্যে আলী হোসেন চৌধুরীকে নজরুল স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের অন্যান্য বক্তা
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ত্রিশালের জাতীয় সংসদ সদস্য ডা. মাহবুবুর রহমান। স্মারক বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর। সম্মানিত অতিথি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কবি পৌত্রি খিলখিল কাজী, নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মো. লতিফুল ইসলাম শিবলী, ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান।



