সংবিধানের ১৮তম সংশোধনীর লক্ষ্যে সরকারি দল বিএনপি যে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে তাতে বিরোধী দল জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাম দেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জামায়াত ও এনসিপি সংবিধান সংশোধন নয়, বরং সংবিধান সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ লক্ষ্যে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এখনো ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ অনুযায়ী ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবিতে অনড় রয়েছে। এই দাবিতে জোটটি রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করছে।
বিএনপির অবস্থান ও আইনমন্ত্রীর প্রস্তাব
এ নিয়ে মতবিরোধের শুরু থেকেই বিএনপি বলছে, বিদ্যমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের কোনো সুযোগ নেই। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ২৯ এপ্রিল এই ১৭ সদস্যবিশিষ্ট বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব রাখেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। কমিটিতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচ জনের নাম দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। তবে, জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সেদিনই সংসদে বলেছেন, এ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তাদের ধারণাগত ভিন্নতা আছে। প্রস্তাবটি নিয়ে নিজেরা আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন।
বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি করার বিষয়ে ১২ জনের নামের তালিকা তারা (সরকারি দল) ঠিক করেছেন। যেখানে বিএনপির সাত জন এবং গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে পাঁচ জন রাখা হয়েছে। আর বিরোধী দল থেকে পাঁচ জনের নাম দিলে মোট ১৭ সদস্যের কমিটি হবে। আইনমন্ত্রী জানান, সংসদ সদস্যদের শতাংশ হিসেবে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ আসে। সেখানে তারা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচ জনের নাম চাচ্ছেন। বিরোধী দল পাঁচ জনের নাম দিলে পরদিন বৃহস্পতিবারই (৩০ এপ্রিল) কমিটি সম্পর্কিত প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপনের কথা বলেছিলেন তিনি। তবে, বিরোধী দল নাম না দেওয়ায় প্রথম অধিবেশনে এই বিশেষ কমিটি আর গঠিত হয়নি।
বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া
আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সংসদের চিফ হুইপ (নূরুল ইসলাম মনি) আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। এ বিষয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনার বিষয় আছে। এখন মত দিতে পারব না। কারণ, আমরা চেয়েছি রিফর্ম (সংস্কার), কিন্তু এখানে হচ্ছে সংশোধন। এই জায়গাটায় আগেও আমাদের মতপার্থক্য ছিল, এখনো এটা রয়েছে। প্রস্তাব ওনারা (সরকারি দল) দিয়েছেন, সেটাকে আমরা নিলাম, শুনলাম। কিন্তু পরে জানাব। এখনই কিছু বলছি না এ ব্যাপারে।’
তবে, ৩০ এপ্রিল সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হওয়ার পর গতকাল রবিবার ১৭ দিন গেলেও এখনো নাম দেয়নি জামায়াত ও এনসিপি। বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই আগামী ৭ জুন শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন, যা বর্তমান সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন হবে।
জামায়াতের অবস্থান
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, জামায়াতের পক্ষ থেকে বিশেষ কমিটিতে কোনো নাম দেওয়া হবে না। আগামী ৭ জুন সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেই কমিটিতে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, এই বিশেষ কমিটি গণভোটের রায়ের প্রতিফলন ঘটাতে পারবে না। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই অনুযায়ী জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের ৭৭ জন সংসদ সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। কিন্তু, বিএনপি ও তাদের মিত্র দলগুলোর সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, শুধু ত্রয়োদশ সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ পাঠ করানোর সাংবিধানিক এক্তিয়ার ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি)। কাউকে কাউকে সংবিধান সংস্কারের সদস্য হিসেবে শপথ পড়িয়ে সিইসি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। এর আগে গত ৩১ মার্চ সরকারি দল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে ‘প্রতারণা’ আখ্যা দিয়ে একটি সর্বদলীয় কমিটি গঠনের সুপারিশ করে। সরকারি দলের অভিযোগ, বিএনপিসহ দলগুলো যেই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ‘ভিন্নমত’ রয়েছে। কিন্তু, জারিকৃত জুলাই সনদ আদেশে সেই ‘ভিন্নমত’ রাখা হয়নি, যা ভয়াবহ প্রতারণা।
জামায়াতের অভ্যন্তরীণ মতভেদ
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিশেষ কমিটিতে নাম না দেওয়ার কথা বললেও দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের জানান, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। শিগিগরই ১১ দলীয় জোটে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে। অবশ্য, এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম জানান, বিশেষ কমিটিতে এনসিপির প্রতিনিধিদের নাম দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ, তাদের দলও সংবিধান সংস্কার পরিষদের পক্ষে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও সমাবেশ
এদিকে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে ইতিমধ্যেই নানা কর্মসূচি পালন করেছে জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট। শনিবার রাজশাহী থেকে শুরু করেছে বিভাগীয় সমাবেশ। দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে এই সমাবেশ করা হবে। এরপর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে ঢাকায় একটি মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে এই জোটের।
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারিকৃত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম ১৮০ কার্যদিবস ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কার্যক্রম করার কথা। এই ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে ৪৮টি সাংবিধানিক সংশোধনী প্রস্তাব সংবিধানে যুক্ত করার কথা ছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ সংবিধান সংস্কারের এই ৪৮টি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের এগুলোর বেশকটিতেই বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) রয়েছে। বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিএনপি যেই সনদে স্বাক্ষর করেছে সেটি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর উদাহরণ
পঞ্চদশ সংশোধনীর জন্য ২০১০ সালে গঠিত বিশেষ কমিটিতে যোগ দেয়নি বিএনপি ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংবিধানের বহুল আলোচিত-সমালেচিত পঞ্চদশ সংশোধনীর জন্য ২০১০ সালে গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটিতে যোগ দেয়নি তত্কালীন বিরোধী দল বিএনপি। তত্কালীন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ছিলেন ঐ কমিটির চেয়ারপারসন এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন কো-চেয়ারম্যান। ১৫ সদস্যের ঐ কমিটিতে জাতীয় পার্টি (জাপা), ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাসদের এক জন করে এমপি ছিলেন। বিএনপি থেকে তিন জন সদস্য নেওয়ার প্রস্তাব করেছিল তত্কালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগ। তবে, বিএনপি কমিটিতে যোগ দেয়নি। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতেই বিলুপ্ত করা হয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা।



