অন্ধ্রপ্রদেশে বড় পরিবারকে আর্থিক প্রণোদনা, জন্মহার বাড়াতে নতুন নীতি
অন্ধ্রপ্রদেশে বড় পরিবারকে আর্থিক প্রণোদনা, জন্মহার বাড়াতে নীতি

ভারতের মতো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জনবহুল দেশে যেখানে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে বরাবরই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, সেখানে সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটে এক অভাবনীয় নীতি ঘোষণা করেছে দেশটির অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার। রাজ্যে জন্মহার বাড়াতে এবং বড় পরিবার গঠনে উৎসাহিত করতে এখন থেকে দুইয়ের বেশি সন্তান নিলেই পরিবারগুলোকে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তাসহ একগুচ্ছ রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়া হবে।

নতুন নীতির ঘোষণা

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সি চন্দ্রবাবু নাইডু শনিবার (১৬ মে) শ্রীকাকুলাম জেলার তামরাপল্লি গ্রামে এক বিশাল জনসমাবেশে এই নতুন জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা নীতির ঘোষণা দেন। নতুন এই প্রকল্পের আওতায় অন্ধ্রপ্রদেশের কোনো পরিবার তৃতীয় সন্তান নিলে এককালীন ৩০ হাজার রুপি এবং চতুর্থ সন্তান নিলে ওই পরিবারকে ৪০ হাজার রুপি নগদ প্রণোদনা দেবে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী নাইডু স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘সন্তানেরা আমাদের বোঝা নয়, বরং সম্পদ। এই ইতিবাচক বার্তাটিই আমি পুরো রাজ্যজুড়ে পৌঁছে দিতে চাই।’

কেন এই নীতি?

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষের দেশ ভারতে কেন জন্মহার বাড়ানোর এই অভিনব নীতি হাতে নেওয়া হলো, তার যৌক্তিক কারণও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু। তিনি জানান, অন্ধ্রপ্রদেশে তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা এবং জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে ক্রমেই কমছে, যার বিপরীতে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে বয়োবৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা। জনমিতির এই মারাত্মক ভারসাম্যহীনতা দূর করতেই রাজ্য সরকার ‘জনসংখ্যার প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে’ বাধ্য হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গত ৫ মার্চ অন্ধ্রপ্রদেশের বিধানসভায় এই নীতির খসড়া পেশ করার সময় মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ১৯৯৩ সালে রাজ্যে মোট জন্মহার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট যেখানে ছিল ৩ দশমিক ০, তা বিগত দশকগুলোতে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে মাত্র ১ দশমিক ৫-এ নেমে এসেছে। অথচ একটি রাজ্যের বা দেশের জনমিতির ভারসাম্য ও অর্থনীতি সচল রাখতে আদর্শ জন্মহার হওয়া উচিত কমপক্ষে ২ দশমিক ১।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু সতর্ক করে বলেন, অন্ধ্রপ্রদেশ যদি এখনই সচেতন না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এটিও জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইতালির মতো তীব্র জনসংখ্যাগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। ওইসব উন্নত দেশে কম জন্মহার এবং কর্মক্ষম মানুষের অভাবের পাশাপাশি অধিকসংখ্যক বয়োবৃদ্ধ মানুষ বর্তমান সময়ে প্রধান অর্থনৈতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৩ সালের পরিসংখ্যান টেনে তিনি জানান, ওই বছর অন্ধ্রপ্রদেশে প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার শিশু জন্ম নিয়েছে। কিন্তু বর্তমানের এই কম জন্মহারের ক্ষতিকর প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে ২০৪৭ সালের মধ্যে রাজ্যে বয়োবৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশে; যা ভবিষ্যতে অন্ধ্রপ্রদেশের অর্থনীতি ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় তহবিলকে চরম দেউলিয়া বা চাপের মুখে ফেলতে পারে।

বড় পরিবারের জন্য সুবিধা

বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশের প্রায় ৩ লাখ পরিবারে (মোট পরিবারের ৫৮ শতাংশ) মাত্র একটি করে সন্তান রয়েছে এবং মাত্র ২ লাখ ১৭ হাজার পরিবারে দুই বা তার বেশি সন্তান রয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রস্তাবিত নীতিতে কেবল এককালীন নগদ প্রণোদনাই রাখা হয়নি, বরং পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক সুরক্ষায় একাধিক দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।

এই নীতির আওতায় রাজ্য সরকার তৃতীয় সন্তানের পুষ্টির জন্য জন্মের পর থেকে টানা পাঁচ বছর প্রতি মাসে ১ হাজার রুপি করে ‘পুষ্টি সহায়তা’ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে ওই শিশুর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত রাজ্য সরকারের সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উচ্চশিক্ষার সুবিধা দেওয়া হবে।

এছাড়া চাকরিজীবী পিতা-মাতাদের সন্তান লালন-পালনে উৎসাহিত করতে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটি ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। নতুন এই নীতি কার্যকর হলে সন্তান প্রসবের পর মায়েরা পাবেন টানা ১২ মাসের (১ বছর) বেতনসহ ছুটি এবং বাবারা পাবেন ২ মাসের বিশেষ পিতৃত্বকালীন ছুটি।

ভারতের রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় এটিকে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী নীতিগত হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।