জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বহাল: ট্রাম্পের উদ্যোগ খারিজ করে রায়কে ‘খুবই খারাপ’ বললেন প্রেসিডেন্ট
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বহাল, ট্রাম্পের উদ্যোগ খারিজ

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ ৬-৩ ভোটে খারিজ করে দিয়েছে। ট্রাম্প এই রায়কে ‘দেশের জন্য খুবই খারাপ’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের মাধ্যমে নতুন আইন পাসের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

রায়ের বিবরণ

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা ট্রাম্পের নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশ বাতিল করেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর জারি করা ওই আদেশে বলা হয়েছিল, যেসব শিশুর মা–বাবা অস্থায়ী বৈধ মর্যাদায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন অথবা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া দেশটিতে আছেন, তাদের শিশুরা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মালেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব পাবে না।

প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের পক্ষে রায়ে লিখেছেন, ‘সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর প্রণেতারা এ দেশের প্রতিটি স্বাধীনভাবে জন্ম নেওয়া মানুষের জন্য এই অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। আজও আমরা সেই অঙ্গীকার রক্ষা করছি।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া

ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘আমাদের দেশের জন্য ব্যয়বহুল ও অন্যায্য জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অবসান ঘটাতে কংগ্রেসের আজ থেকেই কাজ শুরু করা উচিত। এ ক্ষেত্রে তারা আমার পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন পাবে।’ হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ‘ধ্বংসাত্মক ও ন্যক্কারজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় সত্ত্বেও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের লড়াই চালিয়ে যাবে ট্রাম্প প্রশাসন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ট্রাম্পের যুক্তি ও আদালতে বিতর্ক

ট্রাম্প প্রশাসনের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর ভুল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে এত দিন জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা নাগরিকত্বপ্রাপ্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের অধীন সব ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও যে অঙ্গরাজ্যে বসবাস করেন, সেই অঙ্গরাজ্যের নাগরিক।’ প্রশাসনের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল জন সাওয়ার আদালতে যুক্তি দেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের অধীন’—এই বাক্যাংশের অর্থ হলো, কিছু অভিবাসী গোষ্ঠী স্বয়ংক্রিয়ভাবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বাইরে থাকবে। তাঁর মতে, এ সুবিধা কেবল তাঁদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত, যাঁদের স্থায়ী বসবাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য রয়েছে। সাওয়ার আরও বলেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ফলে তথাকথিত ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বেড়েছে।

গবেষণা ও অর্থনৈতিক প্রভাব

মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট (এমপিআই) ও পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক যৌথ গবেষণায় বলেছে, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ কার্যকর হলে প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার শিশু নাগরিকত্বহীন থেকে যেত। এর ফলে ২০৪৫ সালের মধ্যে দেশটিতে অনথিভুক্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যেত আরও প্রায় ২৭ লাখ। সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭৫ থেকে ২০৭৪ সালের মধ্যে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিরা তাঁদের আয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার অবদান রাখবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসনবিষয়ক গবেষক নান্দো সিগোনা বলেন, ‘এ রায়ের মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা নয়, যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্বের সীমা নির্ধারণ করে সংবিধান।’ ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের শিক্ষক রাইনার বাউবক বলেন, সংবিধানের স্পষ্ট ও আক্ষরিক ব্যাখ্যাকে সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে, তাতে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সাধারণ আইন পাস করে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এটি পরিবর্তন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অন্তত ৩০টি দেশে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিধান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কানাডা, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। এডিনবরা ল স্কুলের প্রধান জো শ বলেন, লাতিন আমেরিকার অনেক দেশে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে প্রতিটি দেশের সংবিধান, আইন ও নির্বাহী ক্ষমতার কাঠামো ভিন্ন।