যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক সেনা অভিবাসী বিতাড়নের ঝুঁকিতে: হার্নান্দেজের ঘটনা
যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক সেনা অভিবাসী বিতাড়নের ঝুঁকি

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়াগোতে গত বৃহস্পতিবার সকালে ফেডারেল আদালত ভবনের বাইরে কয়েকজন অধিকারকর্মী জড়ো হন। অধিকারকর্মীদের একজন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ইউনিফর্ম পরা এক তরুণের ছবির পোস্টারের দিকে ইশারা করেন। ইউনিফর্ম পরা তরুণের বুকে তিনটি স্বর্ণপদক লাগানো।

সাবেক নৌবাহিনী সদস্য বেনিতোর গল্প

ব্ল্যাক ডিপোর্টেড ভেটেরান্স অব আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা জেমস স্মিথ বলেন, ‘ইনি আমার ভাই, বেনিতো মিরান্দা হার্নান্দেজ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য।’ স্মিথ ও অন্য অধিকারকর্মীরা যখন হার্নান্দেজের পক্ষে এই বিক্ষোভ করছিলেন, তখন বহু মাইল দূরের এক অভিবাসন আটককেন্দ্রে বন্দী হার্নান্দেজ।

শিশু বয়সে মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন হার্নান্দেজ। তিনি ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেছেন। সামরিক বাহিনীতে তাঁর সেবা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন হার্নান্দেজ যুক্তরাষ্ট্রের সেই সেনাসদস্যদের একজন, যিনি এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীন দেশ থেকে বিতাড়িত হতে চলেছেন বা বিতাড়নের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি

দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর অভিবাসীদের দেশ থেকে বহিষ্কারের তোড়জোড় শুরু করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ক্ষেত্রে অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার রেকর্ড আছে, এমন অভিবাসীদের আগে বিতাড়িত করা হবে বলে জানানো হয়। ট্রাম্পের এই পরিকল্পনায় সাবেক সেনাসদস্যরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন বলে মত অধিকারকর্মীদের। তাঁদের যুক্তি, কারাগার ও সংশোধনাগারে সাবেক সেনাসদস্যদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ, তাঁদের বেশির ভাগই সামরিক সেবার পর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দেশজুড়ে আইসিইয়ের অভিযান অব্যাহত আছে এবং তা আরও জোরদার হচ্ছে। এর ফলে যেসব সাবেক সেনা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাননি, তাঁদের মধ্যে অনেকেই দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই অভিযানের ফাঁদে পড়বেন।

হার্নান্দেজের আটক ও বর্তমান অবস্থা

সামরিক বাহিনী ছাড়ার পর হার্নান্দেজ আবার সাধারণ নাগরিক জীবনে নিজেকে মানিয়ে নিতে সমস্যায় পড়েছিলেন। মাদক-সংক্রান্ত একটি মামলায় দীর্ঘমেয়াদি সাজা ভোগের পর গত ১৪ জুন হার্নান্দেজ কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। কারাফটকে তিনি তাঁর মায়ের অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর মা মারিয়া মিরান্দার তাঁকে নিতে আসার কথা ছিল। ঠিক সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার (আইসিই) কর্মকর্তারা হার্নান্দেজকে আটক করেন। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই মা মিরান্দা তাঁর আরেক ছেলেকে নিয়ে সেখানে পৌঁছান। সেদিন তাঁরা কয়েক ঘণ্টা ধরে হার্নান্দেজকে খুঁজে বেড়ান। তিনি কোথায় গেছেন, তা তাঁরা জানতেন না।

স্প্যানিশ ভাষী মিরান্দা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘সে সবকিছু ঠিকভাবে করছিল। তার অনেক আশা ছিল, অনেক স্বপ্ন ছিল।’ আটকের পর হার্নান্দেজকে সান দিয়াগোর ওটেই মেসা ডিটেনশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য এ বছরের শুরুতেই গ্রিনকার্ড পান হার্নান্দেজ। তা সত্ত্বেও তিনি এখন দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার মুখে।

সাবেক সেনা বিতাড়নের সংখ্যা ও উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্র থেকে এখন পর্যন্ত কতজন সাবেক সেনা বিতাড়িত হয়েছেন, তার সঠিক হিসাব পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, আইসিই দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের আটক করা ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন সাবেক সেনা, সেই তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ তথ্য সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক। একাধিক অধিকারকর্মী আল-জাজিরাকে বলেছেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সেনাসদস্যদের দেশ থেকে বহিষ্কারের ঘটনা বাড়ছে বলে তাদের নজরে এসেছে। গত মার্চে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর অন্তত ৩৪ জন সাবেক সেনাসদস্যকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়নের প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছে।

এগুলোর মধ্যে মাত্র কয়েকটি ঘটনা গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। অধিকারকর্মীরা বলেন, অন্য অনেক অভিবাসী সাবেক সেনা প্রচারের আলো এড়িয়ে চলছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এতে তাঁদের অভিবাসন-সংক্রান্ত মামলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সামরিক নিয়োগ ও নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে জনবলসংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিদেশে পরিচালিত যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য অভিবাসীদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিয়ে আসছে। অভিবাসীদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়ার সময় প্রায়ই বলা হয়, সেনাবাহিনীতে সেবা দিলে ‘ন্যাচারালাইজড সিটিজেনশিপ’ বা আইনি প্রক্রিয়ায় দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাত্ত্বিকভাবে সেটিই হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে হার্নান্দেজের মতো অনেক অভিবাসী সেনা জানিয়েছেন, দায়িত্ব পালনের জন্য মোতায়েন থাকা অবস্থায় তাঁদের ন্যাচারালাইজেশন বা নাগরিকত্বের আইনি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে।

২০০৬ সালে হার্নান্দেজকে নাগরিকত্বের সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়। তত দিনে একটি ফৌজদারি মামলায় তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। ফলে তাঁর নাগরিকত্বের আবেদন বাতিল করা হয়। অথচ এর প্রায় দুই বছর আগে শেষবার সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন হার্নান্দেজ।

সরকারের নীতির সমালোচনা

স্মিথের মতো অধিকারকর্মীরা মনে করেন, অভিবাসী সাবেক সেনাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়া মার্কিন সরকারের সামগ্রিক সামরিক নীতির ত্রুটি মোকাবিলায় ব্যর্থতার প্রতিফলন। স্মিথ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের তৈরি করা পরিস্থিতির দায় স্বীকার করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তারা আমাদের নিয়োগ দেয়, তারপর আমাদের ভেতরে থাকা মানবিকতার একটি অংশ কেড়ে নেয়, যাতে আমরা কোনো অনুশোচনা বা পরিণতির ভয় ছাড়াই মানুষ হত্যা করতে পারি।’ সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর সেনাদের সাধারণ নাগরিক জীবনে ফিরে যেতে প্রস্তুত করার জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না বলেও মনে করেন এই অধিকারকর্মী।

ভবিষ্যৎ ও পরিবারের অবস্থা

হার্নান্দেজের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বৃহস্পতিবারের সমাবেশে স্থানীয় একটি অলাভজনক অভিবাসন-সহায়তা সংস্থার এক আইনজীবী স্মিথ ও অন্য অধিকারকর্মীদের বলেছেন, তাঁর সংস্থা হার্নান্দেজের মামলায় সহায়তা করতে আগ্রহী হতে পারে। এদিকে হার্নান্দেজের মা ছেলেকে মানসিকভাবে দৃঢ় রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। মিরান্দা আইসিইর আটককেন্দ্রে থাকা ছেলের সঙ্গে নিয়মিত ফোনে কথা বলেন এবং প্রতি শনিবার সাক্ষাতের নির্ধারিত সময়ে তাঁকে দেখতে যান। অ্যানাহাইম থেকে সান দিয়াগো যেতে সড়কপথে প্রায় দুই ঘণ্টা লাগে। বয়সের কারণে মিরান্দার জন্য প্রতি সপ্তাহে এই ভ্রমণ কষ্টকর হয়ে যায়। কান্নাভেজা চোখে এই মা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এই শনিবার যখন আমি তার সঙ্গে দেখা করি, তখন সে খুবই, খুবই ভেঙে পড়েছিল। সে বারবার বলছিল, “মা, আমি আর তোমাকে কোনো ঝামেলায় ফেলতে চাই না। আমি তোমাকে আর কষ্ট দিতে চাই না। মা, আমি এখন সবকিছু ঠিকভাবে করছি। নিজের জন্য প্রার্থনা করছি।”’ ছেলের সব স্বপ্ন আবর্জনায় ছুড়ে ফেলা হয়েছে বলেও মনে করেন মিরান্দা। দুঃখ করে তিনি বলেন, ‘তারা একটি পাখির ডানা বেঁধে ফেলেছে। তার সব আশা শেষ হয়ে গেছে। তারা সেগুলোকে (আশা) আবর্জনার স্তূপে ছুড়ে ফেলেছে।’