সন্দ্বীপের সবুজচরে বাইন পদ্ধতিতে ধান চাষে ব্যস্ত কৃষক
সন্দ্বীপের সবুজচরে বাইন পদ্ধতিতে ধান চাষে ব্যস্ত কৃষক

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের সবুজচরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন কৃষকদের ব্যস্ততা। আষাঢ়ের শেষভাগে বালতি আর বস্তায় করে অঙ্কুরিত ধানের বীজ নিয়ে জমিতে ছিটিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। কৃষকদের কাছে এ চাষপদ্ধতির নাম ‘বাইন’। এ পদ্ধতিতে বীজতলা করতে হয় না বলে খরচ ও শ্রম কম লাগে।

কী এই বাইন পদ্ধতি?

বাইন পদ্ধতিতে প্রথমে ধানবীজ অঙ্কুরিত করা হয়। তারপর সারি করে ছিটিয়ে দেওয়া হয় জমিতে। বীজতলা তৈরির বাড়তি ঝামেলা নেই। সপ্তাহখানেকের মধ্যে অঙ্কুরিত বীজ থেকে মাথা তুলে দাঁড়ায় চুলের মতো সরু ধানের চারা। আষাঢ় শেষ হতেই সবুজে ছেয়ে যায় পুরো চর, আর শ্রাবণে বাতাসে দোল খায় পরিপূর্ণ ধানের গাছ।

সন্দ্বীপের উপকূলবর্তী জমিতে কয়েক শ বছর ধরে এ পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে। মৌসুমি বৃষ্টি শুরু হলে, বিশেষ করে আষাঢ়ের প্রথম ভাগে জমিতে পানি জমিয়ে রেখে চাষ দিয়ে নরম কাদামাটি তৈরি করা হয়। একাধিক দফায় জমি চাষ দেওয়ার পর ছিটিয়ে দেওয়া হয় অঙ্কুরিত বীজ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কৃষকের খরচ ও শ্রম সাশ্রয়

চাষিরা জানান, বীজধান তিন দিন ধরে কয়েক দফা পানিতে ডুবিয়ে ও শুকিয়ে শিকড় বেরিয়ে আসা নিশ্চিত করা হয়। প্রতিটি ধানের মুখে সাদা শিকড় বেরিয়ে এলে ছিটিয়ে দেওয়া হয় জমিতে। পানির নিচে নরম কাদায় দ্রুত শিকড় ছড়িয়ে পড়লে পানির উপরে মাথা তোলে ধানের চারা। এতে চাষির শ্রম ও অর্থ ব্যয় কম হয়। চারা গজিয়ে ধানের গোছা জমিতে বুনতে গেলে সময়, শ্রম আর খরচ বেড়ে যায় কয়েক গুণ।

সাদ্দাম হোসেন (৩২) নামের এক চাষি বলেন, ‘গোছা বুনে ধান চাষ করতে গেলে লোক মিলবে না। বিশাল সবুজচরে হাজারো শ্রমিকের দরকার হবে। খরচ বাড়বে, লাভ কমে যাবে।’ এ জন্য বাইন ছিটিয়েই আবাদ করেন তাঁরা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সবুজচরের ধানের জাত ও পরিমাণ

চাষিদের হিসাবে, এবার ডোবাচরসহ সবুজচরের প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় চার হাজার হেক্টর জমিতে ছিটানো হচ্ছে রাজাশাইল ও লেম্বু ধানের বীজ। স্থানীয় রাজাশাইল ধান সন্দ্বীপের উপকূলবর্তী নোনা জমিতে কয়েক শ বছর ধরে চাষ হচ্ছে। ইদানীং স্থানীয় জাত লেম্বু ধানও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাকি এক হাজার হেক্টরে চাষ হচ্ছে স্বর্ণ ইরি, বাংলা শাইল, কাজল শাইলসহ আমনের কয়েকটি জাত।

কৃষি কর্মকর্তার মতে, আয়তনে সবুজচর এখন দেশের বৃহত্তম একক আমনভান্ডার। তবে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের স্বাদুপানির আমনের আবাদ না হওয়ায় উৎপাদন তুলনামূলক কম।

ঝুঁকি ও চাষিদের চিন্তা

স্বল্প শ্রম আর কম খরচে বাইন ছিটিয়ে ধান বুনতে পারলেও চাষিদের কপালে দেখা যায় চিন্তার ভাঁজ। প্রখর রোদ টানা দু-তিন দিন অব্যাহত থাকলেই শুকিয়ে যাবে ধানবীজ। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়বে খরচও। মাইন উদ্দিন (৪০) নামের এক চাষি বলেন, ‘খরানে (খরায়) বাইন না ধরলে (চারা না হলে) ছিদ্দতে (ভোগান্তি) পড়তে হবে। রইদের (রোদের) যে অবস্থা, যেন গায়ের চামড়া পুড়ে যাবে। এ অবস্থা কাল-পরশু চললে মার খাব (ক্ষতির মুখে পড়া)।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মারুফ ইসলাম জানিয়েছেন, সবুজচরের প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের চাষ হয় বাইন ছিটিয়ে বা ব্রডকাস্ট পদ্ধতিতে। খরার মুখে না পড়লে এ পদ্ধতি ভালো কাজ করে। তিনি বলেন, ‘এখানকার আউশ ধানের চাষিরা জমিতে ক্ষুদ্র গর্ত করে শুকনা ধান মাটিচাপা দেন। সেখানেই অঙ্কুরিত হয় ধান। সন্দ্বীপের বাইরে আর কোথাও এমনটি দেখা যায় না।’

সবুজচরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

সন্দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ আর ৩ কিলোমিটার চওড়া সবুজচর। ধানের উৎপাদন, মাছের জোগান আর পশুপালনে সবুজচর এখন উপকূলীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই চরের আয়তন এবং আমনের আবাদ দ্রুত বাড়ছে। চাষিদের প্রত্যাশা—প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও উচ্চ জোয়ারের বড় কোনো ধাক্কা না এলে কার্তিকে সোনালি ধানে ভরে যাবে তাঁদের আঙিনা।