পটুয়াখালীতে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য চাওয়ায় মারধর ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন দুই সাংবাদিক। পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের হিসাবরক্ষক হাসানুজ্জামানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে। আহতরা হলেন—এশিয়া পোস্ট ও এশিয়া টিভির পটুয়াখালী প্রতিনিধি রাকিবুল ইসলাম তনু এবং দৈনিক আজকের খবরের পটুয়াখালী প্রতিনিধি দীপরয়। বর্তমানে তনু পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন, অন্যদিকে দীপরয় চিকিৎসা নিয়ে বাসায় অবস্থান করছেন।
ঘটনার বিবরণ
ঘটনা প্রসঙ্গে তনু বলেন, পটুয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের খাবার সরবরাহে অনিয়ম এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ নিয়ে হিসাবরক্ষক হাসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তিনি জানান, এর আগে হাসানুজ্জামানের কাছে এসব বিষয়ে তথ্য চাওয়া হলে তিনি তথ্য দেওয়ার কথা বলে এড়িয়ে যান। পরে সোমবার (১৫ জুন) দুপুর ২টার দিকে তার অফিস কক্ষে গিয়ে তথ্য চাওয়া হলে তিনি ক্ষিপ্ত হন এবং হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজার কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার কথা বলেন।
তনু বলেন, ‘আমি তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে যাওয়ার উদ্দেশে হিসাবরক্ষকের কক্ষ থেকে বের হতে গেলে রাজ্জাক নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘তুই এ রুমে কেন ঢুকছস, কে তোকে ঢুকতে বলেছে? হাসান ভাই তোকে কেন তথ্য দেবে? তুই কে? পটুয়াখালীর সিনিয়র সাংবাদিকেরা তার পকেটে।’ এ সময় আমি ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে আব্দুর রাজ্জাক এলোপাতাড়ি চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি মারতে থাকেন। এতে আমি মেঝেতে লুটিয়ে পড়লে হাসানুজ্জামান আমার গলায় সজোরে পা দিয়ে চেপে ধরে বলতে থাকেন, ‘তোকে ভাগে পাইছি। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে? বড় বড় সাংবাদিকেরা আমার ধারে-কাছেও আসে না। আর তুই আমার কাছে তথ্য চাইতে আসছস! এবার তোকে ভালো করে তথ্য দিচ্ছি।’ এরপর টেবিলে থাকা একটি ছুরি দিয়ে হাসানুজ্জামান আমার গলায় ও শরীরে আঘাত করেন।’
মোবাইল ফোন ভাঙচুর ও আটক
রাকিবুল ইসলাম তনু জানান, এ সময় তার দুটি মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তথ্য মুছে ফেলা ও ভেঙে ফেলা হয়। প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধরে মারধরের পর তাকে ও দীপরয়কে কক্ষের ভেতরে আটকে রেখে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। আনুমানিক ২০ মিনিট পর এক ব্যক্তি হাসানুজ্জামানকে খুঁজতে এসে বাইরে থেকে দরজা খুলে দেন। এ সময় তারা আত্মরক্ষার্থে হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। তবে হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার বিভিন্ন গেট তালাবদ্ধ করে তাদের আটকে রাখা হয় বলেও অভিযোগ করেন রাকিবুল ইসলাম তনু।
তিনি আরও জানান, এরপর হাসানুজ্জামানের নির্দেশে ক্যাশিয়ার দেলোয়ার হোসেনসহ ছয়-সাত জন রাকিবুল ইসলাম তনুকে টেনেহিঁচড়ে মারধর করে তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে নেওয়ার পরও তাকে পুনরায় মারধর করা হয়। এ সময় তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা হাসানুজ্জামানকে মারধর করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করে পটুয়াখালী প্রেসক্লাবের সহকর্মীদের ফোন দেওয়ার অনুরোধ জানান। প্রায় আধা ঘণ্টা পর পুলিশ ও পটুয়াখালী প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের বিষয়টি অবহিত করেন তত্ত্বাবধায়ক। পরে পটুয়াখালী প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক মো. জাকির হোসেনসহ অন্যান্য সংবাদকর্মী এবং সদর থানা পুলিশ হাসপাতালে পৌঁছে তনু ও দীপরয়কে উদ্ধার করেন।
আহত সাংবাদিকের বক্তব্য
তনু বলেন, পটুয়াখালী প্রেসক্লাব ও পরিবারের সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি কাউকে জানাননি। সুস্থ হয়ে তিনি মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন।
অভিযুক্তের বক্তব্য
অভিযুক্ত হাসানুজ্জামান বলেন, সাংবাদিক তনু আমার কক্ষে প্রবেশ করে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন, যা একজন পেশাদার সাংবাদিকের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত। তাই আমার কক্ষে থাকা আউটসোর্সিং কর্মচারী রাজ্জাক বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে তাকে উত্তম-মধ্যম দিয়েছে। এ সময় তিনি হামলা করেননি বলে দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, পরে বিষয়টি জেলা বিএনপির নেতা টোটন এবং প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক জাকিরকে মুঠোফোনে জানিয়েছি। যেহেতু বিষয়টি এখন বড় পর্যায়ে গেছে, তাই তারা সমাধান করবেন। হামলায় অংশ নেওয়া আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
প্রতিক্রিয়া
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান টোটন বলেন, সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় অপরাধীরা বিএনপিকে জড়িয়ে তাদের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করবে। এটা মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তনুকে উদ্ধার করতে হাসপাতালে যাওয়া সদর থানা-পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হিরণ চন্দ্র দাস জানান, খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে পৌঁছে আহত অবস্থায় সাংবাদিক তনুকে দেখতে পেয়েছেন। এ সময় তার শরীর ও গলায় আঘাতের চিহ্নও দেখেছেন। পরে সেখান থেকে তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
পটুয়াখালী প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক মো. জাকির হোসেন বলেন, পটুয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে রাকিবুল ইসলাম তনু ও তার সহকর্মী হামলার শিকার হয়েছেন। খবর পেয়ে আমরা তাদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। এখন ভুক্তভোগীদের ইচ্ছা অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, একজন সংবাদকর্মী হাসপাতালে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন এমন খবরে পুলিশ পাঠানো হয়। বিষয়টি যেহেতু হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট, তাই তত্ত্বাবধায়ককে বিষয়টি সমাধানের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীরা যদি আইনগত সহায়তা নিতে চান বা মামলা করেন, তাহলে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজার মুঠোফোনে কল দিয়ে পাওয়া যায়নি।



