ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের তিন সাবেক রাজ্যসভা সাংসদ—সুস্মিতা দেব, সুখেন্দু শেখর রায় ও প্রকাশ চিক বরাইক—আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দিয়েছেন। তারা সম্প্রতি তৃণমূল ও রাজ্যসভার সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তারা গেরুয়া শিবিরে শামিল হন। যোগদানের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিজেপি তাদের খালি হওয়া তিনটি আসনের উপনির্বাচনে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। আগামী ২৪ জুলাই এই আসনগুলোতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
‘ভালো’ ও ‘খারাপ’ তৃণমূল তত্ত্ব
তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের বিজেপিতে এই অন্তর্ভুক্তি দলটির আগের অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এর আগে বিজেপি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিল যে, দুর্নীতি ও গুন্ডামির অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো তৃণমূল নেতাকে তারা দলে নেবে না। তবে এই যোগদান প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য একে একটি ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি এর আগে ‘ভালো তৃণমূল এবং খারাপ তৃণমূল’ তত্ত্বের অবতারণা করে বলেছিলেন, ‘ভালো’ (ভদ্র) তৃণমূল নেতাদের দলে নিতে বিজেপির কোনো দ্বিধা নেই।
তৃণমূল ভাঙানোর অভিযান অব্যাহত
সূত্রের খবর, তৃণমূলকে ভাঙার এই অভিযান এখানেই শেষ হচ্ছে না। রুক্মিণী মল্লিক নামের আরও এক তৃণমূল সংসদ সদস্য রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের কাছে ইমেইল মারফত পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন এবং খুব শিগগিরই সশরীরে গিয়ে তা জমা দেবেন। বাকি ৯ জন তৃণমূল এমপির মধ্যে আরও অন্তত দুজন নিকট ভবিষ্যতে বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
রাজ্যসভার নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
নিয়ম অনুযায়ী, দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে তৃণমূলের ১৩ জন রাজ্যসভা এমপির মধ্যে অন্তত ৯ জনের দল পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই সংখ্যা মেলানো সম্ভব না হওয়ায়, বিজেপি কৌশল বদলে প্রথমে এমপিদের পদত্যাগ করাচ্ছে এবং পরে নিজেদের প্রতীকে জিতিয়ে পুনরায় রাজ্যসভায় নিয়ে আসছে। এই কৌশলে তৃণমূল যেমন দুর্বল হচ্ছে, তেমনি রাজ্যসভায় বিজেপির শক্তিও বাড়ছে। ২৪ জুলাইয়ের উপনির্বাচনের পর রাজ্যসভায় বিজেপির নিজস্ব আসন সংখ্যা দাঁড়াবে ১১৭-তে, যা দলটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর ফলে এককভাবে রাজ্যসভায় সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে বিজেপি মাত্র ৬টি আসন দূরে থাকবে। এই সমীকরণে স্বতন্ত্র ৩ এমপি (পরিমল নাথওয়ানি, কার্তিক শর্মা ও দিলীপ রায়) এবং ৭ জন মনোনীত সদস্যের সমর্থনে বিজেপি সহজেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ১২৭ আসন পার করে যাচ্ছে। এছাড়া এনডিএ জোটের শরিক দলগুলোর (টিডিপি, এআইএডিএমকে, জেডিইউ, এনসিপি, শিবসেনা প্রভৃতি) ২৬ জন এমপির সমর্থন মেলালে রাজ্যসভায় এনডিএ-র মোট আসন সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ১৫৩-তে, যা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে মাত্র ১১টি আসন দূরে।
লোকসভা ও বিধানসভাতেও ভাঙনের মুখে মমতা
শুধু রাজ্যসভা নয়, লোকসভাতেও তৃণমূলকে বড় ধাক্কা দিয়েছে বিজেপি। তৃণমূলের ২৮ জন লোকসভা এমপির মধ্যে ২০ জন দল ভেঙে বেরিয়ে গেছেন এবং ‘এনসিপিআই’ নামক একটি অপরিচিত দলের সঙ্গে একীভূত হয়ে এনডিএ জোটকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন কেবল স্পিকারের অনুমোদনের অপেক্ষা।
মমতার দ্বিমুখী আইনি লড়াই
কলকাতায় ৬০ জনেরও বেশি বিধায়ক (এমএলএ) ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল থেকে দল ভেঙে বের হয়ে গেছেন। বিধানসভার স্পিকার ইতোমধ্যেই ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে নির্বাচন কমিশনের কাছে দলীয় প্রতীকের দাবি জানিয়েছে। এর ফলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখন একসঙ্গে দুটি আইনি লড়াই লড়তে হচ্ছে—প্রথমত, কলকাতায় প্রমাণ করা যে তার দলই আসল তৃণমূল; এবং দ্বিতীয়ত, দিল্লিতে ২০ জন বিদ্রোহী লোকসভা এমপির সদস্যপদ বাতিলের জন্য স্পিকারের কাছে লড়াই করা। সূত্র: এনডিটিভি



