ভূমিকম্পপ্রবণ শহর হিসেবে পরিচিত সিলেটে এখনও ফায়ার হাইড্রেন্ট নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়নি। ফলে বড় অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসের জন্য নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহ নেই। হাইড্রেন্টের অভাব এবং প্রাকৃতিক জলাধার কমে যাওয়ায় অগ্নিনির্বাপণ বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
ফায়ার ইঞ্জিনের পানি কতক্ষণ পর্যাপ্ত?
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের মতে, ফায়ার ইঞ্জিনে থাকা পানি মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটের জন্য যথেষ্ট। এই পানি শেষ হয়ে গেলে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা প্রায়ই দুর্গম বা অপ্রতুল। এই সমস্যা সমাধানে ফায়ার সার্ভিস সিলেট সিটি কর্পোরেশনকে (এসসিসি) শহরব্যাপী হাইড্রেন্ট স্থাপনের অনুরোধ জানিয়েছে।
সিলেটের দ্রুত সম্প্রসারণ
সিলেট জেলা শহর থেকে মহানগরে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে শহরটি প্রায় ৭৯.৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং প্রায় ১০ লাখ বাসিন্দা এখানে বসবাস করেন। সিলেট সিটি মাস্টার প্ল্যান (২০১০-২০৩০) অনুযায়ী, শহরের আয়তন আরও বেড়ে ৮৫.১৮ বর্গকিলোমিটার হবে, যা আধুনিক নিরাপত্তা অবকাঠামোর চাহিদা বাড়িয়ে দেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের যুগ্ম সম্পাদক তানজিদুল ইসলাম জানান, সিলেটে প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার স্থাপনা রয়েছে, যার ৪৩ শতাংশ অস্থায়ী কাঠামো। তিনি উল্লেখ করেন যে দ্রুত নগরায়ণের কারণে উঁচু ভবনের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক পুকুর ও জলাধার কমছে, যা জরুরি অগ্নিনির্বাপণকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে।
ফায়ার হাইড্রেন্টের গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন যে ফায়ার হাইড্রেন্ট রাস্তার পাশে ও জনবহুল এলাকায় স্থাপন করা হয়, যা ফায়ার ফাইটারদের সরাসরি পানি সরবরাহের সুযোগ দেয়। এটি ফায়ার ইঞ্জিন দ্রুত পুনরায় পূর্ণ করতে বা সরাসরি অগ্নিকাণ্ডস্থলে পানি পৌঁছাতে সাহায্য করে। হাইড্রেন্ট সাধারণত দুই ধরনের হয়—ওয়েট ব্যারেল (নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ) এবং ড্রাই ব্যারেল (ভালভ চালু করলেই পানি আসে)।
সিটি কর্পোরেশনের অবস্থান
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আলী আকবার বলেন, বাংলাদেশের কোনো শহরে বর্তমানে ফায়ার হাইড্রেন্ট চালু আছে কি না, তিনি জানেন না। ফায়ার সার্ভিস বিষয়টি উত্থাপন করলেও তাৎক্ষণিক কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং কর্তৃপক্ষ অবশিষ্ট পুকুরগুলো সংরক্ষণ করে জরুরি পানি সরবরাহের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
ফায়ার সার্ভিসের আহ্বান
সিলেট বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ফায়ার হাইড্রেন্ট আধুনিক অগ্নিনির্বাপণের অপরিহার্য উপাদান। তিনি জানান, ফায়ার ইঞ্জিনে ১,৮০০ থেকে ৪,৩০০ লিটার পানি থাকে, যা মাত্র ২০-৩০ মিনিটের জন্য যথেষ্ট। কাছাকাছি নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহ না থাকলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ফলে বেশি ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটে। তিনি এসসিসির চলমান মাস্টার প্ল্যানে পর্যাপ্ত হাইড্রেন্ট অন্তর্ভুক্তির আহ্বান জানান।
শিক্ষাবিদের সুপারিশ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও এসসিসি নগর উন্নয়ন কমিটির সদস্য ড. মো. জহির বিন আলম বলেন, সিলেটের ক্রমবর্ধমান উঁচু ভবন ও উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকির জন্য শক্তিশালী অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন। তিনি বলেন, শহরে এবং বড় ভবনেও হাইড্রেন্ট স্থাপন করা উচিত। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, ভবনের জলাধারের এক-তৃতীয়াংশ পানি অগ্নিনির্বাপণের জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে। তিনি সিটি কর্পোরেশনকে নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে এই নিয়ম কঠোরভাবে পালন করার আহ্বান জানান।
ড. আলম জরুরি প্রতিক্রিয়া ও উচ্ছেদের জন্য শহরে খোলা জায়গার অভাবের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শুধু এমসি কলেজ মাঠ ও সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ কিছুটা বড় খোলা জায়গা সরবরাহ করে। তিনি অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি নিবেদিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করেন।
সিটি কর্পোরেশন প্রশাসকের বক্তব্য
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে সিলেটকে একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও টেকসই শহর হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি সরকারের। তিনি জানান, একটি বিস্তৃত মাস্টার প্ল্যান প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে দুর্যোগ প্রস্তুতি, অগ্নি নিরাপত্তা অবকাঠামো ও পরিবেশ সংরক্ষণসহ নগর ব্যবস্থাপনার সব গুরুত্বপূর্ণ দিক অন্তর্ভুক্ত থাকবে।



