মাঠ প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও সমন্বিত উদ্যোগে সারাদেশে সর্বোচ্চ শাস্তিযোগ্য গুরুতর অপরাধের সংখ্যা কমছে। গত ২১ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আয়োজিত মাসিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভায় বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের সামনে এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
অপরাধের পরিসংখ্যান
সভায় উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে জঘন্য বা গুরুতর অপরাধ ২৪টি বা ০.৯২ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের মে মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের মে মাসে এ ধরনের অপরাধ কমেছে ২৩৭টি বা ৮.৪৪ শতাংশ।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন সমন্বয় অধিশাখার কর্মকর্তারা জানান, প্রতি মাসে জেলা প্রশাসকরা সার্বিক পরিস্থিতির প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠান। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়।
বিভাগভিত্তিক অপরাধের তথ্য
ঢাকা বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে গুরুতর অপরাধ ছিল ৫২১টি, ২০২৬ সালের এপ্রিলে ৪৬৬টি এবং মে মাসে ৪৮৫টি। রাজশাহী বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে ৩৪৯টি থেকে কমে ২০২৬ সালের মে মাসে ২৬১টিতে দাঁড়িয়েছে। খুলনা বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে ২৭১টি, ২০২৬ সালের এপ্রিলে ২১৯টি এবং মে মাসে ২৪২টি। বরিশাল বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে ২২২টি এবং ২০২৬ সালের এপ্রিলে ২২১টি। সিলেট বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে ১৯৩টি, ২০২৬ সালের এপ্রিলে ১১৯টি এবং মে মাসে ১২৩টি। রংপুর বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে ৩১৩টি থেকে কমে ২০২৬ সালের মে মাসে ২৬৩টিতে দাঁড়িয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে ১৬৩টি এবং ২০২৬ সালের এপ্রিলে ১৬২টি।
মেট্রোপলিটন এলাকায় ২০২৫ সালের মে মাসে গুরুতর অপরাধ ছিল ৪৮৮টি, ২০২৬ সালের এপ্রিলে ৪১১টি এবং মে মাসে ৪০২টি। সারা দেশে ২০২৫ সালের মে মাসে মোট ২ হাজার ৮০৯টি গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়, যা ২০২৬ সালের এপ্রিলে ২ হাজার ৫৯৬টি এবং মে মাসে ২ হাজার ৫৭২টিতে নেমে আসে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশে অপরাধ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং প্রায় সব ধরনের অপরাধ কমেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। এ সময়ের তথ্য গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আমার কাছে যে পরিসংখ্যান এসেছে, তাতে দেখা গেছে ২০২৫ সালের তুলনায় অপরাধ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ক্যাটাগরিতেই অপরাধ কমেছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অপরাধ দমনে পুলিশ বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখায় তিনটি আলোচিত ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যা মামলার তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া কয়েকজন পুলিশ সদস্য, দৌলতদিয়ার নৌদুর্ঘটনায় যাত্রীদের প্রাণ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নৌ-পুলিশের তিন সদস্য এবং মুন্সীগঞ্জে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় চার আসামিকে গ্রেপ্তারে অবদান রাখা তিন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।
গুরুতর অপরাধের সংজ্ঞা
বাংলাদেশের আইনে যেসব অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, সেগুলোকে গুরুতর বা জঘন্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে পূর্বপরিকল্পিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যা (দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা), নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধিত)-এর ৯ ধারা অনুযায়ী ধর্ষণ ও ধর্ষণের ফলে মৃত্যু, যৌতুকের কারণে নারীর মৃত্যু, মুক্তিপণের জন্য বা হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ (দণ্ডবিধির ৩৬৪-ক ধারা), রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা বা যুদ্ধের উদ্যোগ (দণ্ডবিধির ১২১ ধারা), সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ও মাঠ প্রশাসন অধিশাখার যুগ্মসচিব মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, ‘প্রতিমাসে জেলায় পরিচালিত কার্যক্রম বিভাগীয় কমিশনারদের সভায় উপস্থাপন করা হয়। সেখানকার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়। জেলা প্রশাসকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও প্রয়োজনীয় কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করে। এভাবেই মাঠ পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরিস্থিতির উন্নতি হলে তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়, আর অবনতি হলে করণীয় নির্ধারণ করা হয়।’



