পুলিশ সংস্কারে জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তির আহ্বান
পুলিশ সংস্কারে জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তির আহ্বান

পুলিশ সংস্কারকে কেবল নীতিপত্রে সীমিত না রেখে জবাবদিহি ও স্বাধীন তদারকির ব্যবস্থা করা, পুলিশের কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা ও জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি পুলিশ সংস্কার জাতীয় অগ্রাধিকার হারাচ্ছে উল্লেখ করে এ প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

সোমবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘পুলিশ রিফর্ম ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস, পসিবিলিটিস অ্যান্ড ফিউচার পাথওয়েজ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এ কথা বলেন। এ সভার আয়োজন করে সপ্রান (সকল প্রাণের নিরাপত্তা) নামের একটি সংগঠন।

সংস্কার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি ও প্রতিবন্ধকতা

আয়োজকেরা জানান, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর পুলিশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, এ উদ্যোগের বর্তমান অগ্রগতি ও প্রতিবন্ধকতা, পুলিশ ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার সংকট এবং সংস্কার নিয়ে নাগরিক সমাজের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরির লক্ষ্যে এই গোলটেবিলের আয়োজন করা হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আলোচনার শুরুতে ‘দ্য মিসিং রিফর্ম: হোয়াই পুলিশ রিফর্ম হ্যাজ স্ট্রাগলড টু রিমেইন অন বাংলাদেশ পাবলিক এজেন্ডা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সপ্রানের গবেষক অপসরা ইসলাম। এতে গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ পুলিশের সার্বিক অগ্রগতি, দীর্ঘদিনের জবাবদিহির সংকট ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রবন্ধে বলা হয়, গণ–অভ্যুত্থান চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাত্র চার দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ২৬ হাজারের বেশি গুলি, রাবার বুলেট ও শটগান কার্তুজ ব্যবহার করে। এতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষের চোখে আঘাত লাগে এবং অন্তত ৫৫০ জন স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান। গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে ছররা গুলির মতো বিতর্কিত অস্ত্রের ব্যবহার কমলেও সাউন্ড গ্রেনেড, লাঠিপেটা ও রাবার বুলেট এখনো জনসাধারণের ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে বিতর্কিত গ্রেপ্তার ও আটকের ঘটনাগুলোর প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, পুলিশ সংস্কার নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা ক্রমেই শ্লথ হয়ে গেছে। নিরঙ্কুশ ঐকমত্য ও বিস্তারিত সংস্কার রূপরেখা থাকার পরও পুলিশ সংস্কার এখন জাতীয়ভাবে অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। এ অবস্থায় সংস্কারের পক্ষে শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক–রাজনৈতিক জনসমর্থন গড়ে তোলাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে এতে উল্লেখ করা হয়।

বক্তাদের মতামত

আলোচনায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, সংস্কার শুধু দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়া বা বাহিনীর শক্তি বাড়ানোর বিষয় নয়। বরং মূল প্রশ্ন হলো পুলিশ জনগণের জন্য কাজ করবে নাকি ক্ষমতাসীনদের জন্য। জুলাইয়ের ঘটনাবলি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন, সেটিও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রে বাহিনীতে সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে ফৌজদারি কার্যবিধিতে কিছু সংশোধনকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এসব আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, পুলিশ যেমন সরকারের নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি নিয়মিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে। পুলিশকে রাজনীতিকরণ থেকে মুক্ত করে জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে তরুণ প্রজন্মের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

পুলিশ সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে গোলটেবিলে অসন্তোষ প্রকাশ করেন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা উমামা ফাতেমা। তিনি বলেন, পুলিশ সংস্কার শুধু নীতির মাধ্যমে করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সংস্কার কোনো বাইনারি (চরম বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার) বিষয় নয়। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘ট্রুথ কমিশন ও ট্রানজিশনাল জাস্টিস ছাড়া পুলিশ সংস্কার আদৌ সম্ভব কি না?’

অল্টারনেটিভস নামের একটি প্ল্যাটফর্মের সংগঠক তাজনুভা জাবীন বলেন, সাধারণ মানুষ যেমন সংস্কার চায়, পুলিশ সদস্যরাও নিজেদের সংস্কার চান। এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ।

নাগরিক প্ল্যাটফর্ম অ্যাকটিভেট রাইটসের নির্বাহী পরিচালক শোয়েব আবদুল্লাহ বলেন, পুলিশ সংস্কারের দাবি শুধু জুলাইয়ের ঘটনার পর তৈরি হয়নি; এর শিকড় আরও গভীরে। জুলাইয়ের আগেও পুলিশি নির্যাতন, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রতিবাদ দমনে সহিংসতার অভিযোগ নিয়মিত উঠেছে। তাই পুলিশ সংস্কারকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখতে হবে।

ভয়েস ফর রিফর্মের সমন্বয়ক এ কে এম মাশরুর ফাহিম পুলিশের কর্মকাণ্ডের বিরাজনীতিকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক—উভয় ধরনের হয়রানি ও নিপীড়নের ঘটনা সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

সুইডেন দূতাবাসের মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও জেন্ডার সমতাবিষয়ক ফার্স্ট সেক্রেটারি পাওলা ক্যাস্ট্রো নাইডারস্টাম বলেন, জনগণ যখন পুলিশের প্রতি আস্থা রাখে, তখন তারা আইন মেনে চলতে বেশি আগ্রহী হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল সহায়তার মাধ্যমে জাতীয় পুলিশ সংস্কারে অনুঘটকের ভূমিকা রাখতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের জ্যেষ্ঠ গবেষক তাসকিন ফাহমিনা র‍্যাব বিলুপ্তির ওপর জোর দেন।

ইউএনডিপি বাংলাদেশের রুল অব ল ও মানবাধিকারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রোমানা শোয়াইগার বাংলাদেশে পুলিশ সংস্কারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ইউএনডিপির আগের পুলিশ সংস্কার পরিকল্পনার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে মানবাধিকার কমিশনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

আলোচনায় আরও অংশ নেন বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের পরিচালক শফিকুর রহমান, ডিগনিটি-ড্যানিশ ইনস্টিটিউট এগেইনস্ট টর্চারের বাংলাদেশ প্রকল্প ব্যবস্থাপক আশরাফুল আনোয়ার, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী, দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জাইমা ইসলাম, ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারহান আরিফ প্রমুখ।

গোলটেবিল আলোচনাটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম। সমাপনী বক্তব্য দেন সপ্রানের গবেষণা পরিচালক মো. জারিফ রহমান।