ক্লুলেস হত্যা মামলায় পিবিআইয়ের দুই বছরের তদন্তে ধরা পড়ল আসামি চম্পা হিজড়া
ক্লুলেস হত্যা মামলায় পিবিআইয়ের তদন্তে ধরা পড়ল চম্পা হিজড়া

২০২১ সালের ৭ জুন সকালে ঢাকার আশুলিয়ার এনায়েতপুর এলাকার একটি ফাঁকা জমি থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজন এগিয়ে গিয়ে দেখেন, পড়ে আছে একটি বস্তা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। বস্তা খুলতেই বেরিয়ে আসে এক ব্যক্তির অর্ধগলিত লাশ। সেই লাশ এতটাই পচে গিয়েছিল যে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কে এই ব্যক্তি, কোথায় তাঁর বাড়ি, কী কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে—কোনো প্রশ্নের উত্তরই তখন ছিল না জানা।

মামলার শুরু ও পিবিআইয়ের তদন্ত

এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় হত্যা মামলা হয়। শুরুতে তদন্ত করছিল আশুলিয়া থানা-পুলিশ। তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় সাড়ে তিন মাস পর ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তখনো মরদেহটির পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। কাজেই তদন্তকারীদের প্রথম কাজ ছিল নিহত ব্যক্তির নাম–পরিচয় শনাক্ত করা। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তারা কোনো ক্লু পাচ্ছিলেন না।

পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, “শুরু থেকে এটি ছিল একটি ক্লুলেস হত্যা মামলা। মরদেহের পরিচয় শনাক্ত থেকে আসামিকে গ্রেপ্তার করা—প্রতিটি ধাপে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের মাধ্যমে রহস্য উদ্‌ঘাটন করা হয়েছে।”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সন্দেহভাজন চম্পা হিজড়া

তদন্তের অংশ হিসেবে পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে আশপাশের বিভিন্ন বাড়ির মালিক, ভাড়াটিয়া, স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। একপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য দেন ঘটনাস্থলের পাশের একটি ভবনের মালিক আক্তার হোসেন। তিনি জানান, তাঁর ভবনের নিচতলায় চম্পা হিজড়া (নওশাদ) নামের একজন ভাড়াটিয়া থাকতেন। তাঁর সঙ্গে এক যুবকও থাকতেন। অজ্ঞাতপরিচয় ওই মরদেহ উদ্ধারের এক-দুই দিনের মধ্যে তিনি এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। যাওয়ার সময় বলেছিলেন, তাঁর বাবা গুরুতর অসুস্থ। তাঁকে জামালপুরে যেতে হবে। এর পর থেকে ওই যুবককেও আর এলাকায় দেখা যায়নি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চম্পার বিষয়ে জামালপুরে খোঁজখবর নিতে শুরু করে পিবিআই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও তাঁর পরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা যায়, নওশাদ স্ত্রী মারা যাওয়ার পর চম্পা হিজড়া নাম নেন। তাঁর বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। সেই সঙ্গে জানতে পারেন, নওশাদ ঢাকায় মারা গেছেন—এমন কথাই তাঁর এলাকার মানুষ জানেন। ফলে নওশাদ ওরফে চম্পাকে নিয়ে তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও বাড়ে।

মরদেহ শনাক্তকরণ

নওশাদের বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেলেও তখনো মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। পিবিআই সূত্রে জানা যায়, নওশাদের ব্যবহৃত মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। জানা যায়, ২০২১ সালের ১ জুন রাত ১২টা ১ মিনিটে তাঁর মুঠোফোনে অন্য একটি সিম ব্যবহার করা হয়েছিল। অনুসন্ধানে পিবিআই জানতে পারে, ওই সিম রাকিব হাসান শাওন নামের একজনের নামে নিবন্ধিত। রাকিবের বাবার বাড়ি বরগুনার বামনা উপজেলায়। তদন্তকারী কর্মকর্তারা সেখানে ছুটে যান। জানতে পারেন, ২০২১ সালের ১ জুনের পর থেকে রাকিবের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কোনো যোগাযোগ নেই।

এতে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয় যে মরদেহটি রাকিবের হতে পারে। এরপর পিবিআই রাকিবের বাবার ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মরদেহ থেকে সংগ্রহ করা ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, অর্ধগলিত মরদেহটি রাকিবেরই। রাকিবের বাবা চাকরি থেকে অবসরের পর ঢাকায় এসে সাভারে ব্যবসার পাশাপাশি বসবাস করছিলেন। ২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময় ব্যবসায় লোকসান হলে তিনি পরিবার নিয়ে আবার গ্রামে ফিরে যান। তবে সাভারে থেকে যান রাকিব।

গ্রেপ্তারি ও স্বীকারোক্তি

পিবিআইয়ের নথিতে বলা হয়েছে, রাকিবের মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর চম্পা নাম নেওয়া নওশাদ আশুলিয়া ছেড়ে চলে যান। শুধু গা ঢাকা দেননি; বরং গ্রামে নিজের মৃত্যুর গুজবও ছড়িয়ে দেন। বদলে ফেলেন মুঠোফোন নম্বর। রাকিবের মুঠোফোনের সিমটি ফেলে দেন। তাঁর সন্ধানে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিজড়াদের আখড়ায় খোঁজখবর নিতে শুরু করে পিবিআই। দুই বছরের বেশি সময় পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানতে পারেন, নওশাদের বড় বোন-দুলাভাই আশুলিয়ায় বসবাস করছেন। এরপর তাঁর দুলাভাইয়ের মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করেন।

নওশাদের অবস্থান শনাক্তে তদন্ত কর্মকর্তারা একটি কৌশল খাটান। তাঁর ভগ্নপতিকে ফোন করে জানান, নওশাদের ছেলে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে। ছেলের দুর্ঘটনার খবর ফোন করে নওশাদকে জানাবেন তাঁর দুলাভাই, তখন প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে পারবেন, এটাই আশা ছিল তদন্তকারীদের। তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, তবে ঘটনাটি একটু ভিন্নভাবে ঘটে। নওশাদের ছেলের ‘আহত হওয়ার’ খবর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে খবরটি জানতে পারেন তাঁর সৎভাই। তদন্তকারী কর্মকর্তারা যে নম্বর থেকে ফোন করেছিলেন, তিনি সেই নম্বরে কল ব্যাক করে খবরের সত্যতা জানতে চান। তখন তাঁর মুঠোফোনের যোগাযোগে নজর রাখা শুরু হয়। এভাবে পাওয়া যায় নওশাদের নতুন মুঠোফোন নম্বর।

এরপর ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে হিজড়াদের একটি আখড়া থেকে নওশাদকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি রাকিবকে খুনের কথা স্বীকার করার পর পিবিআই এই মামলার অভিযোগপত্র দেয়। পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, “প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন করা হয়েছে। এই মামলা ধৈর্য, পেশাদারত্ব ও বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের একটি উদাহরণ।”

হত্যার কারণ

পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আশুলিয়ায় বসবাসের সময় রাকিবের সঙ্গে চম্পা হিজড়া নামে নেওয়া নওশাদের পরিচয় হয়। সম্পর্কের এক পর্যায়ে দুজনে একসঙ্গে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়ে এনায়েতপুরে আক্তার হোসেনের বাড়ির নিচতলায় দুই কক্ষের বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন। শুরুতে সম্পর্ক ভালো থাকলেও রাকিবের সঙ্গে অন্য একজনের সম্পর্ক গড়ে ওঠাই খুনের কারণ বলে নওশাদ স্বীকারোক্তিতে জানান।

মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১ জুন রাতে খুন হন রাকিব। সেদিন রাকিব ইয়াবা কেনার জন্য এক হাজার টাকা চাওয়ার পর দুজনের ঝগড়া হয়েছিল। একপর্যায়ে নওশাদকে থাপ্পড় মেরে রাকিব ঘর থেকে বাইরে চলে গিয়েছিলেন। তবে মুঠোফোন রেখে গিয়েছিলেন ঘরে। নওশাদের দাবি অনুসারে, তখন রাকিবের মুঠোফোনে একটি কল আসে। তিনি ফোন ধরে নিজেকে রাকিবের ভাবি পরিচয় দিয়ে কথা চালিয়ে জানতে পারেন, ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তির (হিজড়া) সঙ্গে রাকিবের প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। এ খবর জেনেই তিনি ক্ষুব্ধ হন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এরপর রাকিব বাসায় ফিরলে নওশাদ তাঁকে ওই নারীর বিষয়ে প্রশ্ন করেন। তাতে রাকিব আরও রেগে গিয়ে তাঁকে মারধর শুরু করেন। তখন নওশাদও তা প্রতিরোধ করেন। একপর্যায়ে রাকিবকে বিছানার ওপর ফেলে গামছা গলায় পেঁচিয়ে খুন করেন। রাকিবের মরদেহ পাশের কক্ষে রেখে পাঁচ দিন ছিলেন তিনি। দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে মরদেহটি একটি পাটের বস্তায় ভরে ৬ জুন রাতে ভবনের পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় ফেলে দিয়ে উধাও হয়ে যান নওশাদ।

২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয় পিবিআই। মামলাটি তদন্ত করেছেন ঢাকা জেলা পিবিআইয়ের তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন (বর্তমানে পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরে কর্মরত)। এসআই আনোয়ার হোসেন বলেন, “মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে আছে। তবে সাক্ষী হিসেবে তাঁকে এখনো ডাকেননি আদালত। আসামি রয়েছেন কারাগারে।”