নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ (সিপিএস) এবং কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনার যৌথ উদ্যোগে গত বুধবার (২৪ জুন) 'সীমান্তে পুশ-ইন: বাংলাদেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও নীতিগত বিকল্প' শীর্ষক একটি ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। জুম প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় শিক্ষাবিদ, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সাংবাদিক এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেন এবং বিষয়টি নিরাপত্তা, কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করেন।
পুশ-ইন: দীর্ঘস্থায়ী হুমকি
সিপিএস-এর পরিচালক ও অধিবেশনের সঞ্চালক অধ্যাপক ড. এম জসিম উদ্দিন তার সূচনা বক্তব্যে পুশ-ইন ও সীমান্ত হত্যাকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্থিতিশীলতা এবং সীমান্ত এলাকার মানুষের নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘস্থায়ী হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষকে অবৈধভাবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পুশ-ইন করা হয়েছে। তিনি জাতীয় স্বার্থ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে ভারতের সাথে পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা ও পানি-সহ বিভিন্ন বিরোধের সমাধানের ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
ভারতীয় সীমান্তে উত্তেজনা
অধ্যাপক জসিম আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে মালয়েশিয়া ও চীনে সফল রাষ্ট্রীয় সফর সম্পন্ন করছেন, ঠিক তখনই ভারতীয় সীমান্তে উত্তেজনা, ব্যাপকভাবে ভারতীয় মুসলিমদের পুশ-ইনের চেষ্টা, সীমান্ত হত্যা এবং বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের মতো ঘটনা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনার ক্রিমিনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ বাংলাদেশি-বিরোধী মনোভাব এবং প্রান্তিক সীমান্তবাসীদের প্রতি অমানবিক আচরণের ওপর আলোকপাত করেন। ২০২৪ সালে ভারত সফরের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে তিনি জানান, নিরাপত্তার খাতিরে আয়োজকরা তাকে বাংলাদেশি পরিচয় গোপন রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বিদ্বেষকে আরও গভীর করতে পারে, যার ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ রাষ্ট্রীয় রাজনীতির শিকার হন।
'অখণ্ড ভারত' ধারণা ও সামরিক শক্তি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. শাহিদুজ্জামান বাংলাদেশের অস্তিত্বগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতকে একটি বড় নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করেন। 'অখণ্ড ভারত' ধারণা এবং কয়েকজন ভারতীয় কৌশলবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার লেখা ও মানচিত্রের কথা উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশের ভূখণ্ডের প্রতি সম্ভাব্য হুমকিকে অবহেলা করার বিষয়ে সতর্ক করেন। সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর জোরালো আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কূটনীতির পেছনে সামরিক শক্তি থাকলেই বাংলাদেশ ভারত ও মিয়ানমারের সাথে কার্যকরভাবে দরকষাকষি করতে পারবে। তিনি চীন এবং পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
ভারতে ২ কোটি বাংলাদেশি দাবি: রাজনৈতিক কৌশল
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহেদুল আনাম খান, 'দ্য ডেল্টাগ্রাম'-এর নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধ অভিজ্ঞতা বা প্রতিরোধ সক্ষমতা নেই—এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ ও পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ভারতে ২ কোটি অবৈধ বাংলাদেশি থাকার দাবিকে তিনি কোনো যাচাইকৃত তালিকা ছাড়া বারবার ব্যবহৃত ভারতীয় রাজনীতির অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি, বলিষ্ঠ কূটনীতি এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচিত বাণিজ্য, বাজারে প্রবেশাধিকার, ট্রানজিট এবং যোগাযোগ সুবিধাকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা।
আধিপত্যবাদী নীতি ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী প্রতিবেশীদের প্রতি ভারতের নীতিকে আধিপত্যবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং বলেন, একতরফা পুশ-ইন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রহণ করবে যাকে চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা যাবে, তবে ভারতকে অবশ্যই আগে সঠিক নথিপত্র প্রদান করতে হবে এবং সম্মত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। বৃহৎ পরিসরে পুশ-ইন বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে পারে বলে সতর্ক করে তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় অবস্থান এবং নয়াদিল্লির সাথে সরাসরি কূটনৈতিক সংলাপের আহ্বান জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভারতীয় মুসলমানদের প্রমাণ ছাড়া বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে সীমান্তে পুশ করা উচিত নয়।
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত ও সামাজিক প্রস্তুতি
দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার বলেন, বাংলাদেশ যখনই আধিপত্যকে প্রতিহত করেছে এবং সাহসের সাথে স্বাধীনতা রক্ষা করেছে, তখনই টিকে থেকেছে। ১৯৭৫ সালের পর সীমান্তে কাদেরিয়া বাহিনীর হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি স্মরণ করেন, কীভাবে মওলানা ভাসানী সীমান্তবাসীকে দৃঢ় অবস্থানে থাকার উৎসাহ দিয়েছিলেন এবং জিয়াউর রহমান নিরাপত্তা বাহিনীকে সহায়তা ও স্থানীয় এলাকা রক্ষায় গ্রাম প্রতিরক্ষা দলের (ভিডিপি) ইউনিট গঠন করে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। এ ধরনের সামাজিক প্রস্তুতি পুনর্গঠন, সীমান্তে বেড়া নির্মাণ, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তির উন্নয়ন, সীমান্ত লঙ্ঘনের বিষয়গুলো জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছে তুলে ধরা, কূটনৈতিক মিশনের সংস্কার, সার্ক পুনরুজ্জীবিত করা এবং দেশের মিডিয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। এছাড়া ভারতের যেসব বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকার কর্মী এবং নাগরিক এ ধরনের নীতির বিরোধিতা করেন, তাদের সাথে নিয়মিত আলোচনার ওপর তিনি জোর দেন।
মানবিক ও সার্বভৌমত্বের উদ্বেগ
অধিবেশনের সভাপতি ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী পুশ-ইন ইস্যুটিকে একই সাথে মানবিক ও সার্বভৌমত্বের উদ্বেগ হিসেবে বর্ণনা করেন। বাংলাদেশের কূটনীতি, নজরদারি, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং সীমান্ত প্রস্তুতিতে গুরুতর ঘাটতি রয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, ভারতের সাথে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি আমাদের অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে আমরা দুর্বল না। তিনি সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সিপিএসকে নীতিগত সুপারিশমালা তৈরির তাগিদ দেন এবং নীতি-ভিত্তিক পদক্ষেপের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
প্রশ্নোত্তর ও সমাপ্তি
ওয়েবিনারের প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষকমণ্ডলী ও শিক্ষার্থীরা জাতীয় ঐক্যমতের অভাব, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং যেকোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশি হিসেবে গ্রহণের আগে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের একটি সুস্পষ্ট প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। প্যানেল আলোচকরা সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার, সুষ্ঠু নথিপত্র সংরক্ষণ ও নজরদারি বৃদ্ধি, বলিষ্ঠ কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. নেছার ইউ. আহমেদ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি আলোচকদের ঐতিহাসিক ও নীতিগত দিকনির্দেশনার প্রশংসা করেন এবং এ বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি ও প্রস্তুতি গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
ওয়েবিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম। সিপিএস সদস্যদের মধ্যে অংশ নেন সহকারী অধ্যাপক ড. আনাস আনসার, সিনিয়র লেকচারার পারিসা শাকুর, সহযোগী অধ্যাপক ড. রিয়াসাত খান, অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদ এবং সহযোগী অধ্যাপক ড. জিয়াউল হক আদনান। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য সম্মানিত শিক্ষক, বাইরের আমন্ত্রিত অতিথি, নানা শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজন এবং বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী যুক্ত হন।
বৈধ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিতকরণ, সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার, জাতীয় ঐক্যমত্য গঠন, জাতীয় নিরাপত্তায় প্রতিরোধমূলক কৌশল, বলিষ্ঠ কূটনীতি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালো তৎপরতা এবং আন্তঃসীমান্ত রাজনীতির শিকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার আহ্বানের মধ্য দিয়ে ওয়েবিনারের সমাপ্তি ঘটে।



