দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নতুন অর্থবছর ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নবম জাতীয় পে স্কেল। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে এই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন।
নতুন বেতন কাঠামোর মূল বৈশিষ্ট্য
নতুন বেতন কাঠামোতে বর্তমানের ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে এবং সব পর্যায়ে মূল বেতন দ্বিগুণ থেকে আড়াইগুণ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সর্বনিম্ন গ্রেডের (২০তম গ্রেড) মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের (১ম গ্রেড) মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডে বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে মাসিক বেতন ৪১ হাজার ৯০৮ টাকায় দাঁড়াতে পারে। বেতন বৈষম্য কমাতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত ১:৯.০৭৬ থেকে কমিয়ে ১:৮ করা হয়েছে।
গ্রেডভিত্তিক মূল বেতন পরিবর্তন
- গ্রেড ১: ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
- গ্রেড ২: ৬৬,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা।
- গ্রেড ৩: ৫৬,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা।
- গ্রেড ৪: ৫০,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা।
- গ্রেড ৫: ৪৩,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৬ হাজার টাকা।
- গ্রেড ৬: ৩৫,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭১ হাজার টাকা।
- গ্রেড ৭: ২৯,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৮ হাজার টাকা।
- গ্রেড ৮: ২৩,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৭ হাজার ২০০ টাকা।
- গ্রেড ৯: ২২,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা।
- গ্রেড ১০: ১৬,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩২ হাজার টাকা।
- গ্রেড ১১: ১২,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা।
- গ্রেড ১২: ১১,৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা।
- গ্রেড ১৩: ১১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪ হাজার টাকা।
- গ্রেড ১৪: ১০,২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা।
- গ্রেড ১৫: ৯,৭০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২ হাজার ৮০০ টাকা।
- গ্রেড ১৬: ৯,৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার ৯০০ টাকা।
- গ্রেড ১৭: ৯,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার ৪০০ টাকা।
- গ্রেড ১৮: ৮,৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার টাকা।
- গ্রেড ১৯: ৮,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ৫০০ টাকা।
- গ্রেড ২০: ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা।
বেতন বৃদ্ধির বিকল্প ও প্রভাব
বেতন কমিশনের আলোচনায় দুটি মূল বিকল্প গুরুত্ব পাচ্ছে: প্রথমত, অধিকাংশ গ্রেডে মূল বেতন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি, এবং দ্বিতীয়ত, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন সরাসরি দ্বিগুণ করা। এর ফলে চতুর্থ গ্রেডের অধ্যক্ষ, ষষ্ঠ গ্রেডের সহকারী অধ্যাপক, সপ্তম গ্রেডের প্রধান শিক্ষক ও নবম গ্রেডের প্রভাষকদের মূল বেতনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে ১১তম গ্রেডের শিক্ষক, ১৬তম গ্রেডের অফিস সহকারী এবং ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়কদের বেতনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
পেনশন কাঠামোতে বড় পরিবর্তন
নতুন পে স্কেলের আরেকটি আলোচিত দিক হলো পেনশন কাঠামোর পরিবর্তন। বর্তমানে যেসব অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাচ্ছেন, তাদের পেনশন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অবসরপ্রাপ্তদের জন্য বড় স্বস্তির খবর।
বাস্তবায়ন ও বরাদ্দ
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে আগস্ট বা সেপ্টেম্বর নাগাদ গেজেট প্রকাশিত হলেও জুলাই মাস থেকেই নতুন বেতন কাঠামোর বকেয়াসহ বর্ধিত সুবিধা কার্যকর হবে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পর দীর্ঘ সময়ে খাদ্য, আবাসন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এই নতুন বেতন কাঠামো অত্যন্ত জরুরি ছিল। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কমাতে এই পে স্কেলে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।



