নরসিংদীর আলোচিত কিশোরী সুমনা আক্তার তিথি হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার আসামিরা পাত্র সেজে পিবিআইয়ের কর্মকর্তার অভিযানের মাধ্যমে শনাক্ত হয়েছেন। পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা পাত্র সেজে বাড়িতে গিয়ে সন্দেহভাজনদের অবস্থান নিশ্চিত করেন এবং পরে অভিযান চালিয়ে দুই সহোদর রমজান আলী (লিমন) ও হাসিবুর রহমান (শান্ত)-কে গ্রেপ্তার করেন।
ঘটনার বিবরণ
২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি রাতে নরসিংদী সদর উপজেলার শেখেরচর গ্রামে নিজ বাড়িতে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয় ১৩ বছর বয়সী সুমনা আক্তার তিথিকে। হামলায় গুরুতর আহত হন তার মা আসমা আক্তার। তাঁদের বাড়ি থেকে লুট করা হয় নগদ টাকা।
ঘটনার চার দিন পর ৩১ জানুয়ারি মধ্যরাতে ফরিদপুরের বোয়ালমারী থেকে রমজান ও হাসিবুরকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। তাঁদের কাছ থেকে ১০ লাখ ১ হাজার ১০০ টাকা উদ্ধারের কথা জানানো হয়। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১ ফেব্রুয়ারি নরসিংদী থেকে গ্রেপ্তার করা হয় কাউছার মিয়া ও ইমন আলীকে।
তদন্তের পদ্ধতি
পিবিআই বলছে, হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তকারী কর্মকর্তাদের হাতে দৃশ্যমান কোনো সূত্র ছিল না। বাড়ির আশপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শীও মেলেনি। ফলে তদন্তের শুরুতে একপ্রকার অন্ধকারেই হাতড়াতে হচ্ছিল পিবিআইকে।
এ অবস্থায় তদন্তকারী কর্মকর্তারা নিহত তিথির বাবা মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন। তিনি জানান, তাঁর বড় মেয়ে ও কম্বোডিয়াপ্রবাসী জামাতা নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। সেই টাকা তোলার কাজে সহযোগিতা করতেন তাঁদের পরিচিত ব্যক্তি হাসিবুর রহমান শান্ত।
প্রযুক্তির ব্যবহার
এ তথ্য পাওয়ার পরই তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। হাসিবুরের মুঠোফোনের বিষয়ে প্রযুক্তিগত তদন্ত শুরু করে পিবিআই। তাতে দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের রাতে তিনি নরসিংদীতে অবস্থান করছিলেন। আবার পরদিন ভোরেই চলে যান ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায়। এই অস্বাভাবিক গতিবিধি তদন্তকারীদের সন্দেহ জোরালো করে।
এর মধ্যেই আরেকটি তথ্য মেলে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানতে পারেন, রমজান আলী বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে কিশোরগঞ্জের দিকে যাচ্ছেন। এর পর থেকেই তাঁর গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হয়।
গ্রেপ্তার ও জবানবন্দি
পিবিআই কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুর ও নরসিংদীতে কয়েক দিনের ধারাবাহিক অনুসন্ধান, মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ এবং আত্মীয়স্বজনের সূত্র ধরে তদন্ত চালিয়ে তাঁরা নিশ্চিত হন, রমজান ও হাসিবুর হত্যাকাণ্ডে জড়িত। এরপরই তাঁরা বোয়ালমারীতে গিয়ে অবস্থান নেন এবং শেষ পর্যন্ত পাত্র সেজে চালানো অভিযানের মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের অবস্থান নিশ্চিত করে গ্রেপ্তার করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে তিথি হত্যা ও ডাকাতির পুরো রহস্য। গ্রেপ্তার চার আসামিই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
হত্যার পরিকল্পনা
পিবিআইয়ের তদন্ত ও আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে মোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা থাকার খবর পান রমজান। বড় ভাই হাসিবুরের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, মোফাজ্জলের কম্বোডিয়াপ্রবাসী বড় মেয়ে ও জামাই নিয়মিত তাঁদের কাছে টাকা পাঠাতেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, টাকার লোভ থেকেই ডাকাতির পরিকল্পনা করেন রমজান। পরিকল্পনায় তিনি সঙ্গে নেন কাউছার মিয়া ও ইমন আলীকে। অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে স্থানীয় বাজার থেকে কেনা হয় একটি হাতুড়ি ও রশি।
হামলার ঘটনা
জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে আটটার দিকে তিনজন মোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে যান। তখন মোফাজ্জল বাড়িতে ছিলেন না। রমজান কড়া নাড়লে দরজা খুলে দেয় সুমনা আক্তার তিথি। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ চেপে ধরা হয়। তিথি চিৎকার করে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়।
পিবিআই জানায়, সে সময় মেয়ের চিৎকার শুনে এগিয়ে আসেন মা আসমা আক্তার। তাঁর ওপরও হামলা চালানো হয়। ঘটনাস্থলেই মারা যায় তিথি। গুরুতর আহত হন তার মা। এরপর পুরো বাড়িতে টাকা খুঁজতে থাকেন হামলাকারী ব্যক্তিরা। একপর্যায়ে একটি লাল রঙের বালতিতে কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় রাখা নগদ টাকা খুঁজে পান তাঁরা। সেই টাকা একটি স্কুলব্যাগে ভরে তাঁরা দ্রুত পালিয়ে যান।
মামলার বর্তমান অবস্থা
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই নরসিংদীর পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, “এ মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়েছে। তাতে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে। বিচার শুরু হয়েছে। মামলার শুনানি চলছে।”
পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, “প্রবাসী স্বজনের পাঠানো টাকার লোভ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত এবং মাঠপর্যায়ের অভিযানের সমন্বয়ে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।”



