টঙ্গীর উড়ালসড়কে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে, আতঙ্কিত এলাকাবাসী
টঙ্গী উড়ালসড়কে ছিনতাই: আতঙ্কে এলাকাবাসী, বেড়েছে প্রাণহানি

গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় বিআরটি উড়ালসড়ক ও আশপাশের সড়কে ছিনতাইয়ের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত মোটরসাইকেল আরোহী, পথচারী, শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষ ছিনতাইকারীদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। বাধা দিলে হামলা, ছুরিকাঘাত এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

ছিনতাইয়ের ঘটনায় প্রাণহানি

গত বছরের ১৭ মে দিবাগত রাতে টঙ্গীর টেশিস কারখানাসংলগ্ন বিআরটি উড়ালসড়কে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন রনজু খাঁ (৩০)। তিনি একজন প্রাইভেটকার চালক ছিলেন এবং পাবনার সদর থানার মজিদপুর গ্রামের বাসিন্দা। রাত সাড়ে ১১টার দিকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইকারীরা তার পথরোধ করে। টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তিনি বাধা দেন, তখন ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত হয়ে তিনি উড়ালসড়কের ওপর লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে টঙ্গীবাজার বাটাগেট এলাকায় বিআরটি প্রকল্পের উড়ালসড়কে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে সিদ্দিকুর রহমান (৫৭) নামে এক বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা নিহত হন। তিনি বরিশালের বাবুগঞ্জ থানার বাসিন্দা ইসমাইল ফকিরের ছেলে। চাকরির সুবাদে তিনি পরিবারসহ টঙ্গীর মধুমিতা এলাকার ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আতঙ্কে সাধারণ মানুষ

টঙ্গীর সাতাইশ এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “রাতে উড়ালসড়ক দিয়ে চলাচল করা এখন ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে। মোটরসাইকেল বা রিকশায় একা চলতে সাহস পাই না। কয়েকজন মিলে চলাফেরা করতে হয়। প্রায়ই শুনি কারো মোবাইল, টাকা কিংবা মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পোশাক কারখানার শ্রমিক আবু হানিফ বলেন, “আমাদের অনেক সময় রাত ১১টা-১২টার দিকে ডিউটি শেষ হয়। বাসায় ফেরার পথে আতঙ্কে থাকতে হয়। ছিনতাইকারীরা দলবদ্ধভাবে থাকে। কেউ বাধা দিলে মারধর করে।”

টঙ্গীবাজার এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, “বিআরটি উড়ালসড়ক চালুর পর যাতায়াত সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। রাত নামলেই অনেক স্থান নির্জন হয়ে পড়ে। এ সুযোগে অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে।”

পুলিশি অভিযান ও গ্রেফতার

এলাকাবাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, গাজীপুরের টঙ্গী উড়ালসড়ক, বাটা গেট, স্টেশন রোড, নতুনবাজার, মধুমিতা ও আশপাশের এলাকায় গত ৪-৫ মাসে ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৪৬ জন ছিনতাইকারী গ্রেফতার হয়। এছাড়া টঙ্গী রেলস্টেশন এলাকায় ট্রেনে সংঘটিত ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৯ জনকে গ্রেফতার করে রেলওয়ে পুলিশ। উত্তরা-টঙ্গী করিডোরে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। গত মার্চ মাসেও টঙ্গীতে আরও দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেফতারের তথ্য পাওয়া যায়।

টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মেহেদী হাসান বলেন, “উড়ালসড়ক ও আশপাশের এলাকায় ছিনতাই রোধে নিয়মিত টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রতি রাতেই দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা ছিনতাইকারীদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে।”

টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি আরিফুল রহমান বলেন, “ছিনতাইয়ের সঙ্গে যারা জড়িত তারা মূলত মাদকসেবনকারী। মাদকের টাকার জন্য তারা ছিনতাই করে। গত কয়েক মাসে ৭শ মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত আছে।”

নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উড়ালসড়কের অনেক অংশে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। রাতে পুলিশ টহলও খুব কম দেখা যায়। ফলে ছিনতাইকারীরা সহজেই অবস্থান নিয়ে পথচারীদের টার্গেট করে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে কিছু লাইট সংযোগ দেওয়া হলেও এখন আবার সেগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে।

বনানী এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, “কয়েক সপ্তাহ আগে উড়ালসড়কের ওপর তিন যুবক তার মোটরসাইকেলের গতি রোধ করে মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়। প্রাণের ভয়ে কোনো প্রতিবাদ করতে পারিনি। ছিনতাইকারীরা হাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।” তিনি আরও বলেন, “উড়ালসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং নিয়মিত পুলিশি টহল নিশ্চিত করা হলে ছিনতাই অনেকাংশে কমে আসবে।”

প্রশাসনের বক্তব্য

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান বলেন, “জেলা ও মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় আশঙ্কাজনকহারে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে গেছে। এগুলো বন্ধ করতে দ্রুত পুলিশকে পদক্ষেপ নিতে হবে।”

একই সভায় জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, “মহানগরীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সম্প্রতি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে, যা উদ্বেগজনক।”

টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মেহেদী হাসান আরও বলেন, “ছিনতাই রোধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমরা এলাকাবাসীর সহযোগিতা চাই।”