টাকা ধার না পেয়ে মুয়াজ্জিনের হাতুড়ি হত্যা, ১৬ ঘণ্টায় পুলিশের জালে
টাকা ধার না পেয়ে মুয়াজ্জিনের হাতুড়ি হত্যা, গ্রেপ্তার ১৬ ঘণ্টায়

টাঙ্গাইল শহরের বিশ্বাস বেতকা চার রাস্তা মোড়ের মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. মোশারফ হোসেন টাকা ধার চেয়ে না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে নাজমা আলমকে (৫১) হত্যা করেছেন। পরে ঘরে থাকা স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট করে নেন এবং হত্যার আলামত নষ্ট করে চলে যান। ঘটনার ১৬ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশি তদন্তে মোশারফ হোসেনই হত্যাকারী হিসেবে শনাক্ত হন। মঙ্গলবার তিনি টাঙ্গাইলের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম মাহবুব খানের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি গ্রহণের পর রাত আটটায় তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

ঘটনার বিবরণ

নাজমা আলম টাঙ্গাইল শহরের বিশ্বাস বেতকা এলাকার বাসিন্দা শফিউল আলম ওরফে শাহীনের স্ত্রী। পেশায় ভেটেরিনারি চিকিৎসক শফিউল আলম গত রোববার সকাল ৯টার দিকে পেশাগত কাজে বাসার বাইরে যান। এ সময় তাঁর স্ত্রী নাজমা আলম বাসায় একা ছিলেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গৃহকর্মী বাসায় এসে মূল দরজা চাপানো দেখতে পান। ঘরে ঢুকে সোফার ওপরে হাত বাঁধা রক্তাক্ত ও জ্ঞানহীন অবস্থায় নাজমা আলমকে পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে শফিউল আলম ফিরে এসে বুঝতে পারেন তাঁর স্ত্রীর দুই হাতের সোনার বালা, গলায় থাকা মালা এবং কিছু টাকা চুরি হয়েছে। বাসার ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ডিভিআর মেশিন নেই, মনিটরটিও ভেঙে নষ্ট করা হয়েছে।

মুয়াজ্জিনের ভূমিকা

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে তদন্ত শুরু করে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্থানীয় মসজিদের ইমাম মোশারফ হোসেন (৪২) এসেও এ ঘটনায় উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিয়ে হত্যাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের দাবি জানান। পরে নিহত নারীর স্বামী শফিউল আলম বাদী হয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুলিশের তদন্ত ও গ্রেপ্তার

পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এবং স্থানীয় তথ্যদাতাদের মাধ্যমে অনুসন্ধান শুরু করে। সন্দেহ হয় মসজিদের মুয়াজ্জিন মোশারফ হোসেনের প্রতি। সোমবার পুলিশ মোশারফ হোসেনকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে মোশারফ জানান, রোববার সকালে তিনি কিছু টাকা ধার চাইতে নাজমা আলমের কাছে যান; কিন্তু তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। তখন তাঁর হাতে ও গলায় সোনার গয়না দেখতে পান। পরে সেখানে মোশারফ চা পান করেন। পরে হাত ধোয়ার উসিলায় বেসিনের কাছে গিয়ে সেখান থেকে হাতুড়ি এনে নাজমা আলমের মাথায় জোরে আঘাত করেন। তখন নাজমা আলম অজ্ঞান হয়ে যান। তিনি তাঁর দুই হাতের দুটি স্বর্ণের বালা, গলায় থাকা একটি স্বর্ণের লকেটযুক্ত চেইন এবং নগদ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে নেন। একপর্যায়ে নাজমা আলম গোঙাতে শুরু করলে গামছা দিয়ে তাঁর হাত বাঁধেন এবং গলায় রশি পেঁচিয়ে ধরেন।

আলামত নষ্ট ও স্বীকারোক্তি

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মোশারফ আরও বলেন, হত্যার আলামত ধ্বংস করতে তিনি সিসিটিভির ডিভিআর মেশিন খুলে নেন এবং মনিটরটি ভেঙে নষ্ট করেন। এগুলো ওই এলাকার একটি নালায় ফেলে দেন। মসজিদে তাঁর থাকার জায়গায় গিয়ে রক্ত লেগে থাকা পোশাক ধুয়ে ফেলেন। পরে নাজমা আলমের বাড়িতে গিয়ে অন্যান্য প্রতিবেশীর সঙ্গে মিশে ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করতে থাকেন এবং গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদকালে মোশারফ আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার সম্মতি দেন। মঙ্গলবার তাঁকে টাঙ্গাইল চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়।

জুয়েলারি ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

এ মামলায় পুলিশ শহরের থানা পাড়া এলাকা থেকে সন্তোষ কর্মকার নামের একজন জুয়েলারি ব্যবসায়ীকেও সোমবার গ্রেপ্তার করে। তাঁর কাছে মোশারফ হোসেন লুট করা স্বর্ণালংকার বিক্রি করেছিলেন। সন্তোষ কর্মকারের কাছ থেকে ওই স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া বিশ্বাস বেতকা চার রাস্তার মোড়ের জামে মসজিদে মোশারফ হোসেনের বালিশের নিচ থেকে ২৬ হাজার ৩২০ টাকা এবং হত্যাকাণ্ডের সময় পড়ে থাকা পায়জামা–পাঞ্জাবি জব্দ করা হয়।