অতীতে নানা সময়ে নিজ নিজ সংসদীয় এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়নের নামে সংসদ সদস্যদের জন্য প্রকল্প পাস হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল অর্থও ব্যয় করা হয়েছে। তবে এসব প্রকল্প স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, দুর্নীতি ও টাকা অপচয়ের বড় দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের প্রকল্পের উদ্দেশ্য, আইনি কাঠামো, বরাদ্দ করা অর্থ, বরাদ্দের প্রক্রিয়া, তদারকি ও জবাবদিহি—এসব নিয়ে অনেক প্রশ্ন ও সংশয় রয়েছে। এ বাস্তবতায় নতুন সরকারও সংসদ সদস্যদের জন্য তাঁদের পছন্দমাফিক অবকাঠামো নির্মাণে যে নতুন প্রকল্প নিতে যাচ্ছে, তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাও স্বাভাবিক।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিবরণ
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন (বিভাগওয়ারি) নামের প্রকল্প তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। সিটি করপোরেশনের আওতাধীন সংসদীয় আসন বাদে মোট ২৭৯টি সংসদীয় আসনের রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে এ প্রকল্প নেওয়া হবে। প্রত্যেক সংসদ সদস্যের জন্য ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ রাখা হবে, সেখান থেকে তাঁরা প্রতিবছর ১০ কোটি টাকায় নিজেদের পছন্দমতো অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারবেন।
প্রস্তাবিত প্রকল্প থেকে দেখা যাচ্ছে, সংসদ সদস্যরা তাঁদের বরাদ্দ করা অর্থ থেকে রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, হাটবাজার, ঘাট—এসব অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন করতে পারবেন। স্থানীয় পর্যায়ে এসব অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদের মতো স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর। প্রশ্ন হচ্ছে, স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো থাকার পরও কেন সংসদ সদস্যদের জন্য অবকাঠামো উন্নয়নে আলাদা বরাদ্দ রাখতে হবে?
সংবিধান ও স্থানীয় সরকারের ভূমিকা
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে, সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব আইন প্রণয়ন করা। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, সংসদ সদস্যরা তাঁদের মূল কর্তব্য এড়িয়ে সংসদীয় এলাকায় নানা ধরনের অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোকে অকেজো প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে, অন্যদিকে সংসদীয় আসনগুলোয় সংসদ সদস্যদের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এ ধরনের এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা একদিকে যেমন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিকে উৎসাহিত করে, অন্যদিকে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকেও ভারসাম্যহীন করে দেয়।
এটা সত্যি যে আমাদের মতো দেশগুলোয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচনের আগে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দেন, নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁরা সেসব উন্নয়নকাজ নিজেদের তত্ত্বাবধানে করতে চান। আমরা মনে করি, উন্নয়নকাজের বদলে সংসদ সদস্যদের অবশ্যই আইন প্রণয়নে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
টিআইবির গবেষণা ও দুর্নীতির চিত্র
এ ধরনের প্রকল্পে কতটা দুর্নীতি, অপচয় ও স্বজনপ্রীতি হতে পারে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদন থেকে তার একটি চিত্র পাওয়া যায়। ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ আমলে সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে ৬২৮টি কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ৩৩ শতাংশ স্কিমে কাজের মান ভালো ছিল না। মোট ব্যয়ের ৯-১৩ শতাংশ ব্যয় হয়েছে কমিশন–বাণিজ্যে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য তাঁর ক্ষমতাবলে সরাসরি বিভিন্ন কর্মসূচির কাজ তাঁর পরিবারের সদস্য, আত্মীয় ও দলের কর্মী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে বণ্টন করে দেন।
এ ধরনের দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকল্পে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী লাভবান হলেও শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী হন নাগরিকেরা। কেননা তাঁদের করের অর্থ ঠিকই ব্যয় হয়, কিন্তু সুফল তাঁরা পান না। গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন আমাদের প্রয়োজন, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কোনোভাবেই ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ করে রাখা যাবে না। দুর্নীতি–স্বজনপ্রীতির পুরোনো চক্রের জায়গায় নতুন চক্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।



